বাংলাদেশের ক্ষেত্রে পরিসংখ্যান বলছে, গত কয়েক দশকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় প্রধান খাদ্যশস্যের উৎপাদন অনেক দ্রুত বেড়েছে। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। তবে কৃষিজমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, পানির সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তনের কারণে এই সাফল্য ধরে রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জনশুমারিতে দেশের জনসংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ১৬ কোটি ৯৮ লাখ। ২০২৬ সালে তা আরও বেড়ে প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখের কাছাকাছি হয়েছে বলে বিভিন্ন সাম্প্রতিক হিসাব থেকে ধারণা পাওয়া যায়। অন্যদিকে, খাদ্য উৎপাদনের অন্যতম প্রধান সূচক ধান উৎপাদন কয়েক দশকে বহুগুণ বেড়েছে।
স্বাধীনতার পর জনসংখ্যা বেড়েছে, খাদ্য উৎপাদনও বেড়েছে দ্রুত
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় আড়াই গুণের মতো বেড়েছে। কিন্তু একই সময়ে ধান উৎপাদন বেড়েছে কয়েক গুণ। আধুনিক উচ্চফলনশীল জাত, সেচের সম্প্রসারণ, সার ও কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং কৃষকদের উৎপাদন দক্ষতা বৃদ্ধির কারণে সীমিত জমি থেকে বেশি খাদ্য উৎপাদন সম্ভব হয়েছে।
বিবিএসের সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ১০ লাখ টনে পৌঁছায়, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ১ শতাংশ বেশি এবং ছয় বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধি।
তবে পরের অর্থবছরে উৎপাদন সামান্য কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চাল উৎপাদন আনুমানিক ৪ কোটি ৬ লাখ টন, যেখানে আগের বছর ছিল প্রায় ৪ কোটি ৭ লাখ টন। অর্থাৎ উৎপাদন প্রায় একই জায়গায় থাকলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা ক্রমেই বাড়ছে।
এদিকে FAO-এর হিসাবে, ধানের মোট উৎপাদন ২০২৫ সালে প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টন হওয়ার পূর্বাভাস ছিল। এখানে মনে রাখতে হবে, ধানের ওজন এবং মিলিংয়ের পর চালের ওজন এক নয়, তাই ধানের পরিমাণকে সরাসরি চালের উৎপাদনের সঙ্গে তুলনা করা যাবে না।
মাথাপিছু খাদ্য উৎপাদনের চিত্র কী বলছে?
জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও ধান উৎপাদন দীর্ঘমেয়াদে তার চেয়ে দ্রুত বেড়েছে। ফলে দেশের মানুষের প্রধান খাদ্য চালের ক্ষেত্রে মাথাপিছু উৎপাদন সক্ষমতা আগের তুলনায় বেড়েছে।
কিন্তু খাদ্যনিরাপত্তার হিসাব শুধু চাল দিয়ে হয় না। মানুষের খাদ্যতালিকায় গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি, ফল, মাছ, মাংস, দুধসহ নানা ধরনের খাদ্য রয়েছে। এসব পণ্যের উৎপাদন ও চাহিদার মধ্যে ব্যবধান একেক ক্ষেত্রে একেক রকম।
বিশেষ করে গমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনো আমদানিনির্ভর। ফলে ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি অবস্থান থাকলেও সামগ্রিক খাদ্যব্যবস্থাকে পুরোপুরি দেশীয় উৎপাদনের ওপর নির্ভরশীল বলা যায় না।
কমছে কৃষিজমি, বাড়ছে উৎপাদনের চাপ
বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনের সবচেয়ে বড় ভবিষ্যৎ ঝুঁকিগুলোর একটি হলো কৃষিজমি কমে যাওয়া। বিবিএসের তথ্যের ভিত্তিতে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, দেশের নিট ফসলি জমির পরিমাণ ২০২০ সালের প্রায় ২০.০৮ লাখ একর থেকে ২০২৩ সালে ১৯.৮৩ লাখ একরে নেমে এসেছে। আবাসন, সড়ক, শিল্প ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণের কারণে কৃষিজমির ওপর চাপ বাড়ছে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে একই পরিমাণ বা তার চেয়ে বেশি মানুষকে খাদ্য দিতে হলে কম জমি থেকেই বেশি উৎপাদন করতে হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনও বড় হুমকি
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদন সরাসরি বন্যা, অতিবৃষ্টি, খরা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও তাপমাত্রার পরিবর্তনের ওপর নির্ভরশীল।
২০২৬ সালের মে মাসে হাওর অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পানির কারণে বোরো ধানের ব্যাপক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, ৪৬ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল পানিতে ডুবে যায় এবং সম্ভাব্য ক্ষতি ২ লাখ টনের বেশি হতে পারে। দেশের মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৫৫ শতাংশ আসে বোরো থেকে, ফলে এ ধরনের ক্ষতি সরাসরি খাদ্য সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে।
অন্যদিকে ২০২৫ সালের আউশ ধানের উৎপাদনও বন্যার কারণে গড়ের তুলনায় প্রায় ৯ শতাংশ কম হয়েছিল। তবু বোরো ও আমনের ভালো ফলনের কারণে ওই বছর মোট ধান উৎপাদন গড়ে ৬ কোটি ২০ লাখ টনের মতো হওয়ার পূর্বাভাস দেয় FAO।
আমন-বোরোর ভালো ফলন কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে
সাম্প্রতিক সময়ে উৎপাদন প্রযুক্তির উন্নতি এবং উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাত ব্যবহারের ফলে ধান উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ২০২৬ সালের আমন মৌসুমে উৎপাদন রেকর্ড ১ কোটি ৭৩ লাখ টনে পৌঁছায়, যা আগের বছরের ১ কোটি ৬৫ লাখ টনের তুলনায় ৫ দশমিক ১১ শতাংশ বেশি। উৎপাদন বৃদ্ধির পেছনে ফলন বৃদ্ধিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
অর্থাৎ জমি বাড়ানো ছাড়াও ফলন বাড়িয়ে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। তবে এই উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সেচ, সার, জ্বালানি, পানি ও কৃষি উপকরণের ওপর নির্ভরশীলতাও বাড়ছে।
নতুন চ্যালেঞ্জ পানির সংকট
দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা ইতোমধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং দীর্ঘদিনের অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে সেখানে পানির স্তর নেমে যাচ্ছে।
সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বরেন্দ্র অঞ্চলের ৮২ শতাংশের বেশি এলাকাকে গুরুতর পানি-চাপের মধ্যে থাকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে বিপুল পরিমাণ কৃষিজমি চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়ার আশঙ্কাও তুলে ধরা হয়েছে। ধান উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে যদি ভূগর্ভস্থ পানির ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, তাহলে সেটি দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য উৎপাদনের জন্যই বিপদ ডেকে আনতে পারে।
বাংলাদেশ খাদ্যে কতটা স্বয়ংসম্পূর্ণ?
চালের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ যে অসাধারণ অগ্রগতি করেছে, তা স্পষ্ট। জনসংখ্যা বৃদ্ধির তুলনায় ধান উৎপাদন অনেক দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু সামগ্রিক খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রে এখনো আমদানির প্রয়োজন রয়েছে।
চাল উৎপাদন স্থিতিশীল রাখতে পারলেও গম, ভোজ্যতেল, ডালসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ কিংবা বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থায় সংকট হলে দেশের খাদ্যবাজারে তার প্রভাব পড়ে।
সামনে কী হতে পারে?
বাংলাদেশের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু ‘আরও বেশি খাদ্য উৎপাদন’ নয়; বরং ‘কম জমি, কম পানি ও পরিবর্তিত জলবায়ুর মধ্যে টেকসইভাবে বেশি খাদ্য উৎপাদন’।
এর জন্য প্রয়োজন—
* কৃষিজমি রক্ষায় কঠোর ভূমি ব্যবস্থাপনা;
* কম পানি লাগে এমন ফসল ও প্রযুক্তির সম্প্রসারণ;
* জলবায়ু সহনশীল ধান ও অন্যান্য ফসলের জাত উদ্ভাবন;
* কৃষিতে পানির দক্ষ ব্যবহার;
* মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, জৈব সার ও পরিমিত রাসায়নিক সার ব্যবহার;
* কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো;
* ফসলের বহুমুখীকরণ;
* খাদ্য সংরক্ষণ ও অপচয় কমানো;
* ধাননির্ভরতার পাশাপাশি গম, ডাল, তেলবীজ, সবজি ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাদ্যের উৎপাদন বাড়ানো।
পরিসংখ্যানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বার্তাটি হলো- বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির চেয়ে খাদ্য উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি দীর্ঘ সময়ে দ্রুত হয়েছে। বিশেষ করে ধান উৎপাদনে উচ্চফলনশীল জাত, সেচ ও প্রযুক্তির ব্যবহারে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যকে ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একদিকে জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে কৃষিজমি; বাড়ছে জলবায়ু ঝুঁকি, পানি সংকট ও উৎপাদন ব্যয়।
তাই বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে শুধু কত টন ধান উৎপাদন হলো তার ওপর নয়; বরং কত কম জমি ও পানিতে, কত কম পরিবেশগত ক্ষতি করে এবং কতটা বৈচিত্র্যময় খাদ্য উৎপাদন করা যাচ্ছে- তার ওপর। অর্থাৎ, অতীতের সাফল্য বলছে বাংলাদেশ বেশি মানুষকে বেশি খাদ্য দিতে সক্ষম হয়েছে; আর বর্তমানের বাস্তবতা বলছে, সেই সক্ষমতা ধরে রাখতে কৃষিজমি, পানি ও মাটিকে রক্ষা করাই এখন সবচেয়ে বড় শর্ত।
Safe Food Rights Bangladesh (SFRB)
নিরাপদ খাদ্য, আমাদের অধিকার
74, Bir Uttam C.R Datta Road, Hatirpool, Dhaka-1205, Bangladesh.
© Copyright 2026 - sfrbangladesh.com