স্বল্পমূল্য, সহজলভ্য ও মুখরোচক হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় রাস্তার খাবারের জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছে। চাকরিজীবী, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে স্বল্প ও মধ্যম আয়ের বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রতিদিন এসব খাবার খাচ্ছেন। কিন্তু এসব খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে বড় ধরনের উদ্বেগ। সরকারি এক সমীক্ষায় ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবারে ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এরপরও রাস্তার খাবার নিরাপদ করতে মাঠপর্যায়ে সরকারি সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সীমিত।
দূষিত পানি, ধুলাবালি, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, বিক্রেতার হাত, খাবার রাখার পাত্র এবং মাছি-পোকামাকড়ের মাধ্যমে সহজেই রাস্তার খাবারে জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে। ফলে প্রতিদিন এসব খাবার গ্রহণকারী বিপুলসংখ্যক মানুষ ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন পানিবাহিত ও খাদ্যবাহিত রোগের ঝুঁকিতে থাকছেন।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) ২০১৯ সালের এক গবেষণায় রাজধানীর রাস্তার খাবারে বিপজ্জনক মাত্রায় টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি পাওয়া যায়। ঝালমুড়ি, পানিপুরি, ভেলপুরি, চটপটি, নুডলস, ফলের রস, বিভিন্ন ধরনের ফলের ভর্তাসহ বেশ কিছু জনপ্রিয় রাস্তার খাবারের নমুনা পরীক্ষা করে এ তথ্য পাওয়া যায়।
গবেষণায় প্রতি গ্রাম খাবারে ১ হাজার ১০০টির বেশি টোটাল কলিফর্মস ও ই-কোলাই পাওয়া যায়। অথচ প্রতি গ্রাম খাবারে ৩০টির বেশি এসব ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতিকে বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। গবেষকদের মতে, এসব জীবাণু খাবারের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
এর আগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে সরকারের জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের খাদ্যদ্রব্যে রাসায়নিক দূষণ ও জীবাণু সংক্রমণবিষয়ক সমীক্ষাতেও ঢাকার প্রায় ৯০ শতাংশ রাস্তার খাবার অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল। এসব খাবারে ই-কোলাই ও সালমোনেলার মতো ক্ষতিকর জীবাণু পাওয়া যায়। ২০১৫ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি) পরিচালিত এক গবেষণায় ৫৫ শতাংশ রাস্তার খাবারে ক্ষতিকর জীবাণুর উপস্থিতি এবং ৮৮ শতাংশ বিক্রেতার হাতে অস্বাস্থ্যকর জীবাণু পাওয়া যায়।
১৪০ ধরনের খাবার বিক্রি
ঢাকার ফুটপাত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সামনে, অফিসপাড়া, বিপণিবিতানের আশপাশ এবং আবাসিক এলাকার অলিগলিতে এখন নানা ধরনের রাস্তার খাবার বিক্রি হচ্ছে। ২০১৯ সালে বিএআরসির গবেষণায় রাস্তার পাশে ১৪০ ধরনের খাবার বিক্রির তথ্য উঠে আসে।
এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে ঝালমুড়ি, পিঠা, চটপটি, ফুচকা, চাটনি, মিষ্টি, বার্গার, ডিম, রুটি, পরোটা, পুরি, চিপস, মোয়া, শিঙাড়া, সমুচা, পেঁয়াজু, শরবত, ফলের রস, চা, কোল্ড কফি, হালিম, আইসক্রিম, নুডলস, খিচুড়ি, ভাত ও কাবাবসহ নানা ধরনের খাবার।
২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়েছিল, রাজধানীতে প্রতিদিন প্রায় ৬০ লাখ মানুষ রাস্তার খাবার খান। যদিও বর্তমানে এ বিষয়ে হালনাগাদ ও নির্ভরযোগ্য সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান নেই।
সাশ্রয়ী দাম, স্বাদ এবং সময় বাঁচানোর কারণে রাস্তার খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহ বেশি। বিশেষ করে অফিস-আদালত ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিক এলাকায় এসব খাবারের ক্রেতার সংখ্যা বেশি। শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশও নিয়মিত রাস্তার খাবার খেয়ে থাকে।
পানিই দূষণের বড় উৎস
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাস্তার খাবারে জীবাণু ছড়ানোর অন্যতম প্রধান কারণ অনিরাপদ পানি। খাবার তৈরি ও পরিবেশনের কাজে ব্যবহৃত পানি নিরাপদ না হলে রান্না করা খাবারেও জীবাণু ছড়িয়ে পড়তে পারে।
এ ছাড়া অপরিষ্কার পাত্র, বিক্রেতার হাত, গামছা, কাগজ, খাবার রাখার স্থান ও আশপাশের ধুলাবালি থেকেও জীবাণু খাবারে মিশছে। মাছি ও অন্যান্য কীটপতঙ্গের মাধ্যমেও দূষণ ঘটছে। একই হাতে টাকা নেওয়া ও খাবার পরিবেশন করায় জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা আরও বাড়ছে।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পুষ্টি বিভাগের সাবেক পরিচালক মনিরুল ইসলাম বলেন, দিন দিন রাস্তার খাবারের চাহিদা বাড়ছে, কিন্তু মান কমছে। বিশেষ করে এসব খাবারে ব্যবহৃত পানি সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়। বিপুলসংখ্যক মানুষ এসব খাবার খেলেও বিষয়টি নিয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না। এর প্রভাব মানুষের চিকিৎসা ব্যয় বাড়াতেও ভূমিকা রাখছে।
তদারকিতে সীমাবদ্ধ সরকারি উদ্যোগ
রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের তদারকির ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হলো, অধিকাংশ বিক্রেতাই ভ্রাম্যমাণ। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে রাস্তার খাবারের দোকানের নিবন্ধন বা অনুমোদনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে রাজধানীতে কতজন রাস্তার খাবার বিক্রি করেন বা কোথায় তাঁরা ব্যবসা করছেন, তার পূর্ণাঙ্গ তালিকাও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে নেই।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) খাদ্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বে থাকলেও রাস্তার খাবারের ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম এখনও সীমিত। কর্তৃপক্ষের খাদ্যের বিশুদ্ধতা পরিবীক্ষণ ও বিচারিক বিভাগের পরিচালক সহদেব চন্দ্র সাহা বলেন, রাস্তার খাবারের মান নিয়ে এখন পর্যন্ত তেমন কাজ হয়নি। পরিদর্শন ও পরিবীক্ষণের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সম্প্রতি ঢাকার বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করা হচ্ছে এবং অভিজ্ঞতার আলোকে স্বাস্থ্যকর রাস্তার খাবার নিশ্চিত করতে কিছু প্রস্তাব দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে খাদ্য পরিদর্শকের পদ থাকলেও রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের বিষয়ে নিয়মিত তদারকি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় আনা গেলে প্রশিক্ষণ ও নজরদারি সহজ হবে।
‘স্ট্রিট ফুড ভ্যান’ প্রকল্পেও স্থায়িত্ব আসেনি
রাস্তার খাবার নিরাপদ করতে ২০১৫ সালে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার ‘ইম্প্রুভিং ফুড সেফটি ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্পের আওতায় আইসিডিডিআরবির সঙ্গে একটি জরিপ পরিচালিত হয়। এতে ঢাকায় ১০ হাজারের বেশি রাস্তার খাবার বিক্রেতার তথ্য পাওয়া যায়।
নিরাপদ খাবার পরিবেশনের জন্য ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৪০০টি কাচে ঘেরা ‘স্ট্রিট ফুড ভ্যান’ বিতরণ করা হয়। এসব ভ্যানে রান্নার চুলা, হ্যান্ড গ্লাভস, সাবান ও জীবাণুমুক্ত পানি ব্যবহারের জন্য বিশেষ ফিল্টারসহ প্রয়োজনীয় কিছু ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল।
তবে প্রকল্প শেষ হওয়ার পর অনেক বিক্রেতা ভ্যানের কাচের অংশ খুলে ফেলেন। বর্তমানে এসব ভ্যানের কতগুলো কার্যকর রয়েছে বা কী অবস্থায় আছে, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই।
নির্দিষ্ট স্থানে আনতে হবে বিক্রেতাদের
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাস্তার খাবারকে পুরোপুরি বন্ধ করার পরিবর্তে নিরাপদ করার উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কারণ এটি একদিকে নগরবাসীর খাদ্যচাহিদা পূরণ করছে, অন্যদিকে বহু মানুষের জীবিকার মাধ্যম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক আমিনুল হক ভূঁইয়া বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই রাস্তার খাবার বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সেখানে জীবাণুমুক্ত পানির ব্যবস্থা ও নিয়মিত মান নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বাংলাদেশেও সঠিক ব্যবস্থাপনা ও আন্তরিক উদ্যোগের মাধ্যমে রাস্তার খাবার নিরাপদ করা সম্ভব।
তাঁর মতে, খাবারে জীবাণু থাকার প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করে প্রতিকারের ব্যবস্থা নিতে হবে। রাস্তার খাবার বিক্রেতাদের নিবন্ধনের আওতায় এনে তাঁদের জন্য নির্দিষ্ট স্থান বরাদ্দ দেওয়া হলে মান নিয়ন্ত্রণ ও নজরদারি সহজ হবে।
রাস্তার খাবার দেশের নগরজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠলেও এর নিরাপত্তা এখন জনস্বাস্থ্যের বড় প্রশ্ন। তাই শুধু অভিযান ও জরিমানার ওপর নির্ভর না করে বিক্রেতাদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ, নিরাপদ পানি সরবরাহ, স্বাস্থ্যসম্মত অবকাঠামো এবং নিয়মিত তদারকির সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
সূত্র: সংবাদটি ২০২৩ সালের ০২ ফেব্রুয়ারি প্রথম আলো’তে প্রকাশিত
Safe Food Rights Bangladesh (SFRB)
নিরাপদ খাদ্য, আমাদের অধিকার
74, Bir Uttam C.R Datta Road, Hatirpool, Dhaka-1205, Bangladesh.
© Copyright 2026 - sfrbangladesh.com