দেশের মোট শ্রমশক্তির প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত। কৃষির সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িয়ে আছেন ৩ কোটি ৮ লাখ মানুষ। অথচ কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনশীলতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে বাংলাদেশের একজন কৃষি কর্মীর বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্য ১ হাজার ২৩৬ ডলার। বিপরীতে পাকিস্তানে এ পরিমাণ ৩ হাজার ১৮৬ ডলার, ভারতে ২ হাজার ১৫৯ ডলার। কৃষিতে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, খণ্ডিত জমি, উন্নত বীজের স্বল্পতা এবং কৃষকের দক্ষতা বৃদ্ধিতে কম বিনিয়োগকে উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণ হিসেবে দেখছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্টরা।
আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে কৃষির উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। উন্নত দেশগুলোয় কৃষিকাজের বড় অংশই হচ্ছে যন্ত্রের সাহায্যে। জমি চাষ, বীজ বপন, সেচ, ফসল সংগ্রহ থেকে শুরু করে সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ, প্রতিটি পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে। এতে কম শ্রমিক দিয়ে বেশি উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।
বাংলাদেশের কৃষিতেও যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ছে। তবে তা প্রয়োজনের তুলনায় এখনো সীমিত। ফলে কৃষির সঙ্গে বিপুলসংখ্যক মানুষ যুক্ত থাকলেও শ্রমিকপ্রতি উৎপাদন বাড়ছে না প্রত্যাশিত হারে। অন্যদিকে শিল্প ও সেবা খাতে পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি না হওয়ায় অনেকেই জীবিকার প্রয়োজনে কৃষিতে যুক্ত হচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর শ্রমশক্তি জরিপ অনুসারে, ২০১৭ সালে দেশের মোট শ্রমশক্তির ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষি খাতে নিয়োজিত ছিল। বর্তমানে এ হার বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। কৃষিতে কর্মসংস্থানের এ নির্ভরতা বাড়লেও উৎপাদনশীলতায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ।
কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা বলতে নির্দিষ্ট সময়ে একজন শ্রমিকের মাধ্যমে উৎপাদিত কৃষিপণ্য বা সৃষ্ট মূল্য সংযোজনকে বোঝায়। মূলত একজন কৃষকের শ্রমের বিপরীতে বার্ষিক উৎপাদনের অর্থমূল্যই তার উৎপাদনশীলতা।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, এ খাতে প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহারই উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকার অন্যতম প্রধান কারণ। পাশাপাশি কৃষকের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতার অভাব এবং দক্ষতা বৃদ্ধিতে কম বিনিয়োগ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।
কৃষিতে প্রযুক্তি ও অবকাঠামোর ঘাটতি
বিশ্বব্যাংকের একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির উৎপাদনশীলতার সীমাবদ্ধতার বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটি বলছে, দেশে খণ্ডিত জমি, উন্নত বীজ ও কৃষিপ্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার, কৃষকের বাজারে প্রবেশে প্রতিবন্ধকতা, কৃষিপণ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণাগারের সংকট এবং বিপণন অবকাঠামোর ঘাটতির মতো সমস্যা রয়েছে। পাশাপাশি ধাননির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থা কৃষি খাতে আয় ও বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে সহায়ক হচ্ছে না।
বাংলাদেশের কৃষি ব্যবস্থা মূলত ফসল, মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও উদ্যানতত্ত্ব, এ চারটি খাতের উৎপাদন কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, ২০২৫ সালে এসব খাতে নিয়োজিত একজন কর্মীর শ্রমের বিপরীতে কৃষি উৎপাদনের বার্ষিক অর্থমূল্য ১ হাজার ২৩৬ দশমিক ২২ ডলার। ডলারের বিপরীতে ১২৩ টাকা হিসাবে বাংলাদেশী মুদ্রায় এ অর্থের পরিমাণ ১ লাখ ৫২ হাজার ৫৫ টাকা। সে হিসাবে সব শ্রমিকের কৃষি উৎপাদনের বার্ষিক অর্থমূল্য দাঁড়ায় ৫২ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। আর দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) কৃষি খাতের অবদান ১১ দশমিক ৪ শতাংশ।
সরকারের নীতিনির্ধারকরাও মনে করছেন, যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার না বাড়ানোয় উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। একই পরিমাণ উৎপাদনের জন্য দেশে অন্য অনেক দেশের তুলনায় বেশি শ্রমিকের প্রয়োজন হচ্ছে।
জানতে চাইলে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কৃষি খাতে অন্য দেশগুলো প্রযুক্তিগত ব্যবহারে এগিয়ে গেছে। আমরাও কৃষিতে প্রযুক্তিগত ব্যবহারে যাব। এখন ১০ জন শ্রমিক যেটুকু উৎপাদন করেন, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে দেখা যাবে দুজন শ্রমিকই সেই পরিমাণ উৎপাদন করতে পারছেন। সরকার কৃষিতে প্রযুক্তিগত বিষয়ে জোর দিচ্ছে। এটা বাস্তবায়ন হলে আমাদের উৎপাদনশীলতা বাড়বে।’
কৃষি শ্রমিকপ্রতি উৎপাদনে এগিয়ে পাকিস্তান-ভারত
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির হার বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও উৎপাদনশীলতায় এগিয়ে রয়েছে ভারত। পাকিস্তানও এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চেয়ে অনেক এগিয়ে।
পাকিস্তানে কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমশক্তির হার ৩৬ দশমিক ২ শতাংশ। দেশটির পরিসংখ্যান বিভাগের হিসাব অনুসারে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কৃষি খাতে কর্মীর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ৫৬ লাখ।
বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, পাকিস্তানের কৃষি খাতে প্রতিকর্মীর বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ৩ হাজার ১৮৬ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ লাখ ৯১ হাজার ৮৭৮ টাকা। দেশটির সব কৃষিকর্মীর বার্ষিক উৎপাদনশীলতার আর্থিক মূল্য দাঁড়ায় ৯৩ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার।
প্রতিবেশী ভারতের মোট শ্রমশক্তির ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। কৃষি খাতে কর্মসংস্থানের হারে বাংলাদেশের কাছাকাছি হলেও উৎপাদনশীলতায় দেশটি এগিয়ে রয়েছে।
ভারতের কৃষি শ্রমিকের বার্ষিক উৎপাদনশীলতা ২ হাজার ১৫৯ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ২ লাখ ৬৫ হাজার ৫৫৭ টাকা। দেশটির কৃষি খাতের সব কর্মীর উৎপাদনের বার্ষিক অর্থমূল্য দাঁড়ায় ৬৪২ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।
কৃষি খাতে নিয়োজিত শ্রমিকের সংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও উৎপাদনশীলতায় অন্য দেশগুলোর চেয়ে এগিয়ে রয়েছে মালদ্বীপ। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, দেশটির একজন কৃষি শ্রমিকের বছরে উৎপাদিত পণ্যের অর্থমূল্য ৮ হাজার ৬৭২ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যার পরিমাণ ১০ লাখ ৬৬ হাজার ৬৫৬ টাকা।
এ ছাড়া নেপালে কৃষি শ্রমিকপ্রতি বার্ষিক উৎপাদন ৫ হাজার ৩৯ ডলার বা ৬ লাখ ১৯ হাজার ৭৯৭ টাকা। শ্রীলংকায় এ পরিমাণ ৩ হাজার ৩৩৪ ডলার বা প্রায় ৪ লাখ ১০ হাজার টাকা।
কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতায় ছোট আয়তনের দেশ ভুটান তুলনামূলক পিছিয়ে রয়েছে। সেখানে একজন কৃষি শ্রমিকের উৎপাদনশীলতা ১ হাজার ৯৯০ ডলার বা ২ লাখ ৪৪ হাজার ৭৭০ টাকা।
অন্যদিকে কৃষকের উৎপাদনশীলতায় দক্ষিণ এশিয়ায় সবার পেছনে রয়েছে যুদ্ধবিধ্বস্ত আফগানিস্তান। দেশটির কৃষিতে একজন শ্রমিকের উৎপাদনের বার্ষিক অবদানের হালনাগাদ হিসাব নেই। তবে ২০২৪ সালের তথ্য বিবেচনায় বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আফগানিস্তানে একজন কৃষি কর্মীর বার্ষিক শ্রমের অর্থমূল্য ১ হাজার ১৫৩ ডলার। বাংলাদেশী মুদ্রায় যা ১ লাখ ৪১ হাজার ১৯ টাকা।
প্রযুক্তির অভাবে বাড়ছে শ্রমনির্ভরতা
বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিপুলসংখ্যক মানুষ নিয়োজিত রয়েছেন। এ খাতে নতুন উদ্যোক্তারাও এগিয়ে আসছেন। সাম্প্রতিক সময়ে কৃষিতে উচ্চশিক্ষিত তরুণদের আগ্রহও বাড়ছে। তবে কৃষির উৎপাদনশীলতায় পিছিয়ে থাকার পেছনে জমির স্বল্পতা, পুঁজির সংকট, প্রযুক্তির কম ব্যবহার এবং উন্নত বীজের সীমিত প্রাপ্যতা ও ব্যবহারকে দায়ী করছেন কৃষি অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা।
তাদের মতে, কৃষিতে অন্য দেশগুলো যেসব কাজ যন্ত্রের সাহায্যে করছে, বাংলাদেশে সেসব কাজের অনেকটাই এখনো শ্রমিকের মাধ্যমে করানো হচ্ছে। ফলে কৃষি খাতে নিয়োজিত জনশক্তির সংখ্যা বাড়লেও সে অনুপাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের কৃষি খাতে প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত। এ খাতে কৃষকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা কম, যার প্রতিফলন উঠে আসছে কৃষির উৎপাদনশীলতায়। কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি গ্রহণ, ব্যবহারে অভ্যস্ততা না থাকায় দক্ষিণ এশিয়ায় আমরা পিছিয়ে পড়ছি।’
কৃষকের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে জমি ও খামারে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন ড. জাহাঙ্গীর আলম। তিনি আরো বলেন, ‘কৃষকদের প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও দক্ষতা তৈরিতে সরকারি-বেসরকারি খাতকে আরো এগিয়ে আসতে হবে। পাশাপাশি এজন্য বিনিয়োগও বাড়াতে হবে।’
কৃষিতে কর্মসংস্থানের চাপ, বৈচিত্র্যহীন অর্থনীতি
দেশে বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত থাকায় কৃষিতে বেশি মানুষ যুক্ত হয়েছেন। তবে আধুনিক কৃষির চর্চা পর্যাপ্তভাবে গড়ে ওঠেনি বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুর রাজ্জাক।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘আমাদের সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে শিল্প ও প্রযুক্তিসহ অন্যান্য খাতে কর্মসংস্থান তৈরি হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ চার-পাঁচ বছরে কৃষিতে মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। বিভিন্ন দেশ আধুনিক কৃষিতে যুক্ত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশে আধুনিক কৃষির চর্চা সেই অর্থে হচ্ছে না। তার পরও মানুষ যুক্ত হচ্ছে। কারণ দেশে কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আসেনি।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প ও সেবা খাতে প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হওয়ায় অনেকেই জীবিকা নির্বাহের জন্য যেকোনোভাবে কৃষিতে যুক্ত হচ্ছেন। ফলে কৃষির ওপর কর্মসংস্থানের নির্ভরতা কমাতে নতুন ও বৈচিত্র্যময় খাত তৈরি করা জরুরি।
দেশে কর্মসংস্থানে বৈচিত্র্য আনতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আব্দুর রহমান তরফদার।
বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘দেশে বিভিন্ন নতুন খাত, বিশেষ করে ডিজিটাল নানা খাত তৈরি হয়েছে বা হচ্ছে। এসব জায়গায় তরুণদের দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তোলা হচ্ছে। আমরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দিচ্ছি। কৃষিতে আমাদের কর্মসংস্থান বেশি। সরকার এখানে মেকানাইজেশনে কাজ করছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হঠাৎ করেই পরিবর্তন হবে না। পর্যায়ক্রমে এসব জায়গায় কাজ করা হবে।’
কৃষিতে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে প্রযুক্তির ব্যবহার, কৃষকের দক্ষতা উন্নয়ন এবং কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মসংস্থানের নতুন ক্ষেত্র তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, কৃষিতে আধুনিকায়ন ও অর্থনীতিতে কর্মসংস্থানের বৈচিত্র্য, দুই ক্ষেত্রেই অগ্রগতি না এলে কৃষির ওপর অতিরিক্ত শ্রমশক্তির চাপ কমানো কঠিন হবে।
Safe Food Rights Bangladesh (SFRB)
নিরাপদ খাদ্য, আমাদের অধিকার
74, Bir Uttam C.R Datta Road, Hatirpool, Dhaka-1205, Bangladesh.
© Copyright 2026 - sfrbangladesh.com