ছোট দেশ, বড় সাফল্য: ১৮৬ দেশের মধ্যে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ শুধুমাত্র একটি দেশ

দক্ষিণ আমেরিকার ছোট্ট দেশ গায়ানা। বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তাহীনতা যখন বড় চ্যালেঞ্জ, তখন দেশটি নিজেদের প্রয়োজনীয় খাদ্য উৎপাদনে দেখিয়েছে ব্যতিক্রমী সাফল্য। একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, সাতটি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠীর সব কটিতেই নিজস্ব উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ একমাত্র দেশ গায়ানা।

১৮৬টি দেশের খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা বিশ্লেষণ করে করা ওই গবেষণায় সাতটি প্রধান খাদ্যগোষ্ঠী বিবেচনায় নেওয়া হয়। এগুলো হলো: ফলমূল, শাকসবজি, দুধ ও দুগ্ধজাত খাবার, মাছ, মাংস, ডাল-বাদাম-বীজ এবং শর্করা বা শ্বেতসারজাতীয় প্রধান খাদ্য, যেমন চাল ও আলু।

কিন্তু কীভাবে এই সাফল্য অর্জন করেছে গায়ানা? এর পেছনে রয়েছে দেশটির অনুকূল প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা এবং তুলনামূলক কম জনসংখ্যাসহ বেশ কিছু কারণ।

অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটি

নিরক্ষরেখার কাছাকাছি অবস্থিত গায়ানায় সারা বছর উষ্ণ আবহাওয়া বিরাজ করে। পাশাপাশি দেশটিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয় এবং অনেক এলাকায় মাটি বেশ উর্বর। এসব প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য নানা ধরনের ফসল উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছে।

দেশটির কৃষকেরা অনেক সময় একই জমিতে একাধিক ফসল চাষ করেন। কৃষির এ পদ্ধতিকে বলা হয় মিশ্র চাষ। যেমন- নারকেলবাগানের ফাঁকে ফাঁকে আনারস বা টমেটো চাষ করা হয়। আবার ভুট্টার সঙ্গে একই জমিতে সয়াবিনও চাষ করা হতে পারে।

এভাবে জমির সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা যায়। পাশাপাশি বিভিন্ন ফসলের সমন্বয়ে মাটির স্বাস্থ্য ও উর্বরতা বজায় রাখতেও সহায়তা পাওয়া যায়।

পরিবেশবান্ধব কৃষিপদ্ধতি

গায়ানায় ফসল চাষের পাশাপাশি পশুপালনও করা হয়। এ ধরনের সমন্বিত কৃষিব্যবস্থা মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা বজায় রাখতে এবং মাটিক্ষয় কমাতে সহায়তা করতে পারে।

পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মাটির স্বাস্থ্য ও জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার এবং দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা বজায় রাখার কৃষিপদ্ধতিকে বলা হয় পুনরুৎপাদনশীল কৃষি। গায়ানার কৃষিব্যবস্থার কিছু চর্চার সঙ্গে এ ধারণার মিল রয়েছে।

বাংলাদেশেও মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা, ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো এবং পরিবেশবান্ধব চাষাবাদে এ ধরনের কৃষিপদ্ধতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

কম জনসংখ্যাও বড় সুবিধা

গায়ানার জনসংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। বিশ্বের অনেক দেশের তুলনায় দেশটির জনসংখ্যা কম। ফলে নিজস্ব খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে দেশের মানুষের চাহিদা পূরণ করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

তবে শুধু কম জনসংখ্যাই গায়ানার স্বয়ংসম্পূর্ণতার ব্যাখ্যা নয়। দেশটির প্রাকৃতিক পরিবেশ, কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা এবং খাদ্যগোষ্ঠীভিত্তিক উৎপাদনের সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ।

কেন অধিকাংশ দেশ নিজেদের সব খাবার উৎপাদন করতে পারে না?

বিশ্বের অধিকাংশ দেশই নিজেদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের খাবার নিজেরা উৎপাদন করতে পারে না। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি কারণ।

প্রথমত, সব দেশের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য এক নয়। কোনো দেশে হাড়কাঁপানো ঠান্ডা, আবার কোনো দেশে প্রচণ্ড শুষ্ক আবহাওয়া বা মরুভূমি রয়েছে। ফলে সব দেশে সব ধরনের ফল, সবজি বা শস্য উৎপাদন সম্ভব হয় না।

দ্বিতীয়ত, অনেক দেশের আয়তনের তুলনায় চাষযোগ্য জমি কম। নতুন শহর, শিল্পকারখানা ও অবকাঠামো গড়ে ওঠার কারণে অনেক জায়গায় কৃষিজমির পরিমাণ আরও কমছে। এতে খাদ্য উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে।

তৃতীয়ত, অনেক দেশের জনসংখ্যা বিপুল। নিজস্ব উৎপাদন দিয়ে এত মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা কঠিন হওয়ায় তাদের আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

চতুর্থত, কিছু দেশ নির্দিষ্ট ফসল উৎপাদনে বেশি দক্ষ। তারা ওই ফসল বেশি পরিমাণে উৎপাদন করে অন্য দেশে রপ্তানি করে। বিনিময়ে নিজেদের প্রয়োজনীয় অন্যান্য খাদ্য আমদানি করে। অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশ থেকে খাদ্য কেনা, নিজ দেশে উৎপাদনের তুলনায় কম ব্যয়সাপেক্ষ। এটি আধুনিক বৈশ্বিক বাণিজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

গায়ানার সাফল্য তাই শুধু খাদ্য উৎপাদনের গল্প নয়; বরং প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি ব্যবস্থাপনা ও জনসংখ্যার চাহিদার মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরিরও উদাহরণ।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ