
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় বাংলাদেশ মান বা নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় সম্প্রতি মসলা, ঘিসহ বেশ কিছু পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)। একই সঙ্গে নিম্নমানের এসব পণ্য না কিনতে ভোক্তাদের পরামর্শ দিয়েছে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি।
গত জুলাইয়েও মানদণ্ড পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় চার প্রতিষ্ঠানের খাদ্য, কসমেটিকসসহ আট ধরনের পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দিয়েছিল বিএসটিআই।
নিয়মিত নজরদারির অংশ হিসেবে বিএসটিআই প্রায়ই বাজার থেকে বিভিন্ন কোম্পানির পণ্য সংগ্রহ করে নিজস্ব ল্যাবরেটরিতে মান যাচাই করে। পাশাপাশি নকল, অনুমোদনহীন, মেয়াদোত্তীর্ণ ও লাইসেন্স ছাড়া পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালিয়ে ব্যবস্থা নেয় প্রতিষ্ঠানটি।
তবে প্রশ্ন হলো, একজন ভোক্তা কীভাবে বুঝবেন কোনো পণ্য মানহীন বা নিম্নমানের? বিএসটিআই কোনো পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পর সেটি বাস্তবে বাজার থেকে সরানো হয়েছে কি না, তা কীভাবে নজরদারি করে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি?
কীভাবে বুঝবেন মানহীন পণ্য
বাংলাদেশে খাদ্যসংক্রান্ত ১২১টি প্যাকেটজাত পণ্যের তদারকি করে বিএসটিআই। আর সব ধরনের খাদ্যের বিষয়ে তদারকির দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
একজন ভোক্তা অন্তত তিন থেকে চারটি উপায়ে প্যাকেটজাত খাবারের মান ঠিক আছে কি না কিংবা তাতে ভেজাল আছে কি না, সে সম্পর্কে ধারণা পেতে পারেন।
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান বলেন, এর একটি উপায় হলো কিউআর কোড স্ক্যান করা।
তিনি বলেন, “প্যাকেটজাত পণ্যের গায়ে কিউআর কোড থাকে। সেটি মোবাইলে স্ক্যান করলেই বোঝা যাবে।”
তিনি আরও বলেন, সাধারণত সুপারশপগুলো নিয়ম মেনে পণ্য কেনে। ফলে সেখানে তুলনামূলকভাবে অথেনটিক পণ্য পাওয়ার সুযোগ বেশি।
মি. সফিকুজ্জামান বলেন, “অথেনটিক জিনিস পেতে হলে আমার সাজেশান হলো সাধারণত সুপার শপগুলো অথেনটিক পণ্য কেনার প্রকিউরমেন্ট করে থাকে। কিন্তুই যত গ্রামের দিকে যাবেন ততই তারা সাব-স্ট্যান্ডার্ড প্রডাক্ট দেয়।”
প্যাকেটজাত পণ্যের মোড়কের কিউআর কোড স্ক্যান করলে কীভাবে পণ্য সম্পর্কে জানা যায়, সে বিষয়ে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান, এতে পণ্য সম্পর্কে নির্দিষ্ট কিছু তথ্য পাওয়া যায়।
“যে খাবারটা প্যাকেট হয় সেটির মোড়কে কয়েকটি তথ্য অবশ্যই উল্লেখ থাকবে। আবার কিউআর কোডও থাকবে। সেটি স্ক্যান করলেই বুঝা যায়। যদি নকল হয় তাহলে কিউআর কোডে কিন্তু ডিটেইলস তথ্য আসবে না। আর প্রডাক্টটি যদি জেনুইন হয় তাহলে কিউআর কোডে সব তথ্য আসবে,” বলেন মি. হক।
প্যাকেটের তথ্যেও মিলবে ধারণা
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়কে বেশ কিছু তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে উল্লেখ করতে হয়। এসব তথ্য না থাকলে মান নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন পাওয়া যায় না।
“প্যাকেজিং ল এর মধ্যে আছে আইটেমটার নাম কি, কারা উৎপাদন করেছে তাদের ঠিকানা কী, কতটুকু ওজন, কবে উৎপাদন হয়েছে, মেয়াদ শেষে তারিখ কবে, কি কি উপাদান দেয়া হয়েছে খাবার তৈরিতে, প্যাকেটজাত খাদ্যে এই তথ্যগুলো থাকা বাধ্যতামূলক। যদি না থাকে তাহলে বুঝতে হবে সামথিং রং” বলেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক মি. হক।
একই সঙ্গে আইন অনুযায়ী, প্যাকেটের ধরন ঠিক না হলেও কোনো কোম্পানিকে প্যাকেটজাত পণ্য বাজারজাতের অনুমতি বা লাইসেন্স দেওয়া হয় না। ফলে একজন ভোক্তা প্যাকেটের ধরন দেখেও পণ্যের মান সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা পেতে পারেন।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক বলেন, “প্যাকেটের ধরন এয়ারটাইট বা বায়ু নিরোধক প্যাকেট হতে হবে। কোন ধরনের লুজ প্যাকেট মানে সেটির ভেতরে বাতাস ঢুকে খাবার ড্যাম হয়ে যাচ্ছে। মানে কি প্যাকেজিং হয়নি, এগুলোকে বিএসটিআই অনুমোদন দেয় না।”
প্রত্যাহারের পর পণ্য বাজারে থাকলে কী হয়
কোনো পণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করতে হলে একটি কোম্পানিকে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুযায়ী বিএসটিআইয়ের কাছ থেকে উৎপাদন ও বাজারজাতের সনদ নিতে হয়।
বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হক জানান, বিএসটিআই নির্ধারিত মান অনুযায়ী উত্তীর্ণ হলেই কোনো কোম্পানিকে লাইসেন্স দেওয়া হয়। তবে পরবর্তীতে লাইসেন্সধারী প্রতিষ্ঠান ওই পণ্যের ক্ষেত্রে বিএসটিআই নির্ধারিত মান থেকে বিচ্যুত হলে তাদের কারণ দর্শানোর নোটিশ এবং পণ্য প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়।
এরপর প্রতিষ্ঠানটি নোটিশের জবাবে ব্যাখ্যা দিতে পারে। একই সঙ্গে পণ্যের মান ঠিক করে পুনরায় যাচাইয়ের জন্য বিএসটিআইকে অনুরোধ করতে পারে। তখন বিএসটিআই আবার ওই কোম্পানির পণ্য সংগ্রহ করে মান পরীক্ষা করে। পরীক্ষায় মান ঠিক থাকলে পণ্যটি পুনরায় বাজারে বিক্রি করা যায়।
তবে কোনো পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়ার পরও সেটি বাজারে পাওয়া যাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে নজরদারি প্রসঙ্গে কাজী ইমদাদুল হক বলেন, শাস্তির ভয়ে দোকানিরা ওই পণ্য নেবেন না।
এ ক্ষেত্রে বিএসটিআইয়ের বিবৃতি, প্রচারণা ও গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদে ভোক্তারা সচেতন ও সতর্ক হবেন বলে মনে করেন তিনি।
তবে বিএসটিআইয়ের নির্দেশের পরও কোনো দোকানে ওই পণ্য পাওয়া গেলে পরবর্তী নজরদারির সময় ওই দোকানের মালিককেই শাস্তির আওতায় আনা হয় বলে জানান সরকারি প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক।
৬৪ জেলার মধ্যে কার্যালয় ২৩টিতে
দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৩টিতে বিএসটিআইয়ের কার্যালয় রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির লোকবল সংকটের কথা উল্লেখ করে মি. হক বলেন, “কোনো দোকানে আছে, কোথায় আছে ….বাংলাদেশ তো বিরাট একটা ব্যাপার। সব খুঁজে দেখা কঠিন একটা ইস্যু। আমাদের ম্যানপাওয়ারের একটা ব্যাপার তো আছেই।”
এ ছাড়া যেসব কোম্পানি বিএসটিআইয়ের লাইসেন্স বা অনুমোদন ছাড়াই পণ্য উৎপাদন ও বাজারে বিক্রি করে, সেগুলো বেআইনি ও ভেজাল বলে জানান মি. হক।
কত কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
মানহীন, ভেজাল বা নকল পণ্য শনাক্ত ও ব্যবস্থা নিতে বিএসটিআই, জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ তদারকি ও অভিযান চালায়। এসব প্রতিষ্ঠান ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমেও অভিযান পরিচালনা করে।
বিএসটিআইয়ের ওয়েবসাইটে দেখা যায়, নিম্নমানের, নকল, অনুমোদনহীন, লাইসেন্সবিহীন ও মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য উৎপাদনকারীদের বিরুদ্ধে প্রায় নিয়মিতই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালানো হয়। এসব অভিযানে জরিমানা, পণ্য জব্দ ও কারখানা সিলগালার মতো শাস্তি দেওয়া হয়।
ওয়েবসাইটটিতে এ ধরনের ৩১টি অভিযানের তথ্য রয়েছে।
বিভিন্ন গণমাধ্যমের খবর পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ২০১৯ ও ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি পণ্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল।
বিএসটিআই নির্ধারিত মান না থাকায় ২০১৯ সালে দুই দফায় ৭০টির বেশি পণ্যকে নিম্নমানের ঘোষণা করে বাজার থেকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
প্রথম ধাপে ৩১৩টি পণ্যের মান পরীক্ষা করে ৫২টি পণ্যকে নিম্নমানের ঘোষণা করে বিএসটিআই। পরে কয়েকটি পণ্য মান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলে সেগুলোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।
এরপর দ্বিতীয় দফায় অবশিষ্ট ৯৩টি পণ্যের মান পরীক্ষা করে নতুন করে ২২টি নিম্নমানের পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
পরের বছর, ২০২০ সালে, পণ্যের নিম্নমানের জন্য বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ৪৩টি পণ্যের বিরুদ্ধেও একই নির্দেশ দিয়েছিল বিএসটিআই।
‘বাংলাদেশে এমন কোনো পণ্য নাই…’
কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি এ এইচ এম সফিকুজ্জামান আক্ষেপ করে বলেন, “বাংলাদেশে এমন কোন পণ্য নাই যেটা নিম্নমানের, ভেজাল বা নকল হয় না। কসমেটিকস হোক, খাবার হোক, প্রতিটা জিনিসই ভেজাল, নকল হয়। ভোক্তাদের এ বিষয়ে সচেতন করতে ক্যাব কাজ করে যাচ্ছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, খাবারজাত পণ্যের ক্ষেত্রে নকল হওয়ার তুলনায় নিম্নমানের পণ্য তৈরি হয় বেশি। অন্যদিকে বিভিন্ন প্রসাধনী সামগ্রী, শিশুখাদ্য, টয়লেট্রিজ ও ইলেকট্রনিক পণ্য বেশি নকল হয়ে থাকে।
তবে বাংলাদেশে এসব বিষয় তদারকির দায়িত্বে থাকা সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ক্যাবের সভাপতি।
“আইনি ব্যবস্থার ক্ষেত্রে তাদের সক্ষমতার অভাব আছে এবং কঠোর মনিটরিং বা কঠোর কমপ্লায়েন্স দেয়ার মতো ক্যাপাসিটি তাদের নেই এবং উৎসাহ ও আগ্রহও কম” বলেন এ এইচ এম সফিকুজ্জামান।
অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক কাজী ইমদাদুল হকও নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন।
মি. হক জানান, লোকবল স্বল্পতার কারণে সারা বাংলাদেশে বিএসটিআইয়ের পক্ষে নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা সম্ভব নয়।
ফলে সরকারি প্রতিষ্ঠানটি এখন ভোক্তাদের সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।
সূত্র: বিবিসি বাংলা
