কুড়িগ্রামে সার-কাণ্ড: গুদাম ভাঙচুর করে সার নিয়ে গেলেন কৃষকেরা

কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে বিলম্বকে কেন্দ্র করে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা এক ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সার নিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। সোমবার সকাল ৯টা থেকে ১০টার মধ্যে বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে।

ডিলারপক্ষের দাবি, গুদাম থেকে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ বস্তা ইউরিয়া সার নিয়ে গেছেন কৃষকেরা। তবে সার লুটের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রৌমারী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তাঁর ভাষ্য, সার লুটের যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে, সেটি ভুয়া। বন্দবেড় ইউনিয়নে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। তিনি বলেন, রৌমারী উপজেলায় ৪২ হাজার কৃষক রয়েছেন এবং তাঁরা সবাই সঠিকভাবে সার পাচ্ছেন।

স্থানীয় একাধিক কৃষক জানান, সোমবার বন্দবেড় বাজারে সার বিতরণের কথা ছিল। এ জন্য কৃষকেরা রাত দুইটা থেকেই গুদামের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। কিন্তু সকাল হয়ে গেলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পরে সকাল ৯টা থেকে ১০টার দিকে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করেন এবং সেখান থেকে সার নিয়ে বের হয়ে যান।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে কয়েকজন কৃষককে গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার বের করতে দেখা যায়। তাঁদের কেউ মাথায় করে, আবার কেউ ভ্যানে করে সারের বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন। খবর পেয়ে পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে কৃষকেরা যে সার নিয়ে গেছেন, তা এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি।

মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম জানান, গুদামে মোট ৭৫০ বস্তা সার ছিল। সোমবার সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নেওয়ার জন্য সেখানে জড়ো হন। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তাঁরা থানায় এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। এ সুযোগে কৃষকেরা গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে প্রায় এক থেকে দেড় শ বস্তা সার নিয়ে যান।

সাইফুল ইসলাম বলেন, পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা অবশিষ্ট সার বিতরণ করা হচ্ছে। বিতরণের হিসাব শেষ হলে কত বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে।

রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী বলেন, সকালে সার বিতরণের সময় পুলিশকে জানানো হয়নি। এ সময় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যান বলে কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

ভূরুঙ্গামারীতে সড়ক অবরোধ, কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ

একই দিন কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় চাহিদা অনুযায়ী সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেছেন কৃষকেরা। এ সময় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখেন তাঁরা।

সোমবার সকালে উপজেলার সোনাহাট এলাকায় সার বিতরণ শুরু হলে কৃষকেরা চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ তোলেন। একপর্যায়ে তাঁরা সড়কে আগুন জ্বালিয়ে অবরোধ সৃষ্টি করেন। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে গেলে ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন। পরে পুলিশ গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করে।

ভূরুঙ্গামারী থানার ওসি আজিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রতিদিন সার নিয়ে কৃষকেরা বিক্ষোভ করছেন। কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধও করছেন তাঁরা। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে প্রতিদিনই যেতে হচ্ছে।

ওসি বলেন, কৃষি বিভাগে কী পরিমাণ সার মজুত আছে এবং কৃষকদের চাহিদা কত, তা পরিষ্কারভাবে জানানো হলে এ ধরনের সমস্যা কমত। কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত সার থাকার কথা বলছে, অথচ কৃষকেরা সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করছেন। এতে পুলিশের অন্য কাজ ব্যাহত হচ্ছে।

জেলায় পর্যাপ্ত সার আছে বলে দাবি করেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন। তাঁর মতে, আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য কৃষকেরা বাড়তি সার মজুত করায় কোথাও কোথাও সাময়িক সংকট তৈরি হচ্ছে। সমন্বয়ের মাধ্যমে সার বিতরণের চেষ্টা করা হচ্ছে।

এর আগে রবিবার সার দিতে দেরি হওয়ার অভিযোগে নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে একটি পরিবেশকের গুদামে ভাঙচুর করেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। একই দিন সারের দাবিতে ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় সড়কে বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা। এ ছাড়া লালমনিরহাটেও একই দাবিতে সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটে।

এরও আগে ২৩ আগস্ট ভূরুঙ্গামারী উপজেলার শিলখুড়ি ইউনিয়নের ধলডাঙ্গা বাজারে এক ডিলারের গুদামের বেড়া ভেঙে ২২৫ বস্তা সার নিয়ে যান কৃষকেরা। পরে প্রশাসনের আশ্বাসে তাঁরা ১১৫ বস্তা সার ফেরত দেন।

ওই ঘটনায় ধলডাঙ্গা বাজারের সারের ডিলার মেসার্স শাহ আমানত এন্টারপ্রাইজের বিরুদ্ধে কৃষকদের সময়মতো সার না দেওয়া এবং ক্যাশমেমোতে অসংগতির অভিযোগ ওঠে। পরে প্রতিষ্ঠানটিকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়।

সূত্র: প্রথম আলো

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ