
আধুনিক জীবনের আরাম ও সুবিধার আড়ালে লুকিয়ে থাকতে পারে দীর্ঘস্থায়ী এক রাসায়নিক বিপদ। ননস্টিক রান্নার পাত্র, পানি প্রতিরোধী পোশাক, খাদ্য মোড়ানোর উপকরণ, কিছু প্রসাধনী ও শিল্পপণ্যে ব্যবহৃত বিশেষ রাসায়নিকের একটি বড় পরিবার হলো PFAS: Per- and Polyfluoroalkyl Substances। পরিবেশে দীর্ঘদিন টিকে থাকার বৈশিষ্ট্যের কারণে এগুলো পরিচিত ‘ফরএভার কেমিক্যাল’ বা চিরস্থায়ী রাসায়নিক নামে।
এই রাসায়নিকের কিছু ধরন পরিবেশে সহজে ভাঙে না। দূষিত পানি, খাবার ও বিভিন্ন উৎসের সংস্পর্শে এগুলো মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে। কিছু PFAS রক্তে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এবং শরীর থেকে বের হতেও দীর্ঘ সময় নেয়। ফলে বারবার সংস্পর্শ ঘটলে শরীরে এসব রাসায়নিকের মাত্রা বাড়তে পারে।
উদ্বেগের বিষয় হলো, PFAS দূষণ শুধু পরিবেশের সমস্যা নয়; নির্দিষ্ট কিছু রাসায়নিকের সঙ্গে মানুষের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, হরমোনের কার্যক্রম, প্রজননস্বাস্থ্য এবং কয়েক ধরনের ক্যানসারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই এই অদৃশ্য দূষণ নিয়ে সচেতনতা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ এখন জনস্বাস্থ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
মানবস্বাস্থ্যে কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি করে?
PFAS নিয়ে উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো, নির্দিষ্ট কিছু যৌগের দীর্ঘমেয়াদি সংস্পর্শের সঙ্গে একাধিক স্বাস্থ্যসমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের বিষাক্ত পদার্থ ও রোগ নিবন্ধন সংস্থা (ATSDR) এবং অন্যান্য গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে রয়েছে—
ক্যানসারের ঝুঁকি: PFOA-এর সংস্পর্শের সঙ্গে কিডনি ও অণ্ডকোষের ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থায় প্রভাব: শিশুদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কিছু টিকার পর অ্যান্টিবডি তৈরির প্রতিক্রিয়া কম হওয়ার সঙ্গে কয়েকটি PFAS-এর সম্পর্ক রয়েছে।
লিভার ও কোলেস্টেরল: কিছু PFAS-এর সংস্পর্শের সঙ্গে লিভারের এনজাইমের পরিবর্তন এবং রক্তে কোলেস্টেরল বৃদ্ধির সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
গর্ভাবস্থা ও শিশুর বিকাশ: কিছু PFAS-এর সঙ্গে গর্ভাবস্থায় উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া এবং শিশুর জন্মকালীন ওজন সামান্য কম হওয়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
থাইরয়েড ও হরমোনের ওপর প্রভাব নিয়েও গবেষণা চলছে। তবে সব PFAS-এর ক্ষেত্রে একই প্রভাব প্রমাণিত হয়নি। এসব সম্পর্কের অর্থ এই নয় যে রাসায়নিকের সংস্পর্শে এলেই নিশ্চিতভাবে রোগ হবে; ঝুঁকি নির্ভর করে রাসায়নিকের ধরন, সংস্পর্শের মাত্রা ও সময়কালের ওপর।
বাংলাদেশের জন্য কেন এটি জরুরি?
বাংলাদেশে PFAS নিয়ে উদ্বেগের পেছনে এখন গবেষণালব্ধ প্রমাণও রয়েছে। ২০২৫ সালের ১৫ আগস্ট প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকার বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর পানি ও তলানিতে ১৫ ধরনের PFAS পরীক্ষা করা হয়। গবেষণায় সব নদীর নমুনায় পরীক্ষাধীন রাসায়নিকগুলো শনাক্ত হয়। পানিতে মোট PFAS-এর ঘনত্ব ছিল প্রতি লিটারে ২৩.৯৬ থেকে ৮৯.৩৫ ন্যানোগ্রাম। গবেষকেরা বুড়িগঙ্গায় তুলনামূলক বেশি দূষণ শনাক্ত করেন এবং শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ ও দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন।
এই ফলাফল বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। দেশের শিল্পাঞ্চল থেকে নির্গত বর্জ্য, অপর্যাপ্ত বর্জ্য পরিশোধন এবং দূষিত নদীর ওপর মানুষের নির্ভরতা বিবেচনায় নিয়ে PFAS-এর উৎস ও বিস্তার সম্পর্কে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
তবে নদীর পানিতে PFAS শনাক্ত হওয়ার অর্থ এই নয় যে বাংলাদেশের মানুষের রক্তেও একই মাত্রায় তা রয়েছে। এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে মানুষের রক্ত, পানীয় জল ও খাদ্যপণ্যের নমুনা নিয়ে পরিকল্পিত গবেষণা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের করণীয় তাই তিনটি: দূষণের উৎস শনাক্ত করা, মানুষের সংস্পর্শের মাত্রা নিরূপণ করা এবং জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কার্যকর নিয়ন্ত্রণ গড়ে তোলা। পরিবেশ অধিদপ্তর, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ ঝুঁকির প্রকৃত ব্যাপ্তি বোঝা কঠিন।
কীভাবে ঝুঁকি কমানো সম্ভব?
PFAS দূষণ একদিনে দূর করা সম্ভব নয়। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও সরকারি উদ্যোগের মাধ্যমে সংস্পর্শ কমানোর সুযোগ রয়েছে।
১. বিকল্প পণ্য বেছে নেওয়া: প্রয়োজন অনুযায়ী স্টেইনলেস স্টিল বা কাস্ট আয়রনের রান্নার পাত্র ব্যবহার করা যেতে পারে। পোশাক ও গৃহস্থালি পণ্য কেনার সময় প্রস্তুতকারকের PFAS-মুক্ত সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য বিবেচনা করা যেতে পারে। তবে সব ননস্টিক পাত্রেই একই ধরনের PFAS রয়েছে, এমন নয়।
২. নিরাপদ পানীয় জল নিশ্চিত করা: পানিতে PFAS দূষণের আশঙ্কা থাকলে প্রথমে পরীক্ষা করে দূষণের মাত্রা জানা জরুরি। নির্দিষ্ট ধরনের অ্যাক্টিভেটেড কার্বন, আয়ন-বিনিময় ব্যবস্থা ও রিভার্স অসমোসিস প্রযুক্তি পানির PFAS কমাতে পারে। তবে সব ফিল্টার সমান কার্যকর নয়; উপযুক্ত প্রযুক্তি নির্বাচন ও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ জরুরি।
৩. শিল্পবর্জ্য নিয়ন্ত্রণ: PFAS-যুক্ত বর্জ্য যাতে অপরিশোধিত অবস্থায় নদী ও মাটিতে না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। শিল্পপ্রতিষ্ঠানের রাসায়নিক ব্যবহার, বর্জ্য পরিশোধন ও নির্গমন নিয়মিত পর্যবেক্ষণের আওতায় আনতে হবে।
৪. কঠোর আইন ও গবেষণা: ঝুঁকিপূর্ণ PFAS-এর উৎপাদন ও ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ, নিরাপদ বিকল্পের প্রসার এবং দূষণের তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশের ব্যবস্থা প্রয়োজন। বাংলাদেশের জন্য জাতীয় পর্যায়ে নিয়মিত পরিবেশগত পরীক্ষা ও জনস্বাস্থ্য গবেষণা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখার এখনই সময়
PFAS সংকট শুধু একটি রাসায়নিকের গল্প নয়; এটি উন্নয়ন, শিল্পের দায়বদ্ধতা, পরিবেশের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের সঙ্গে জড়িত। যে রাসায়নিক পণ্যকে দীর্ঘস্থায়ী করে, সেই রাসায়নিকই পরিবেশে দীর্ঘদিন থেকে গেলে তা নতুন বিপদের কারণ হতে পারে।
বাংলাদেশের নদীতে PFAS শনাক্ত হওয়ার গবেষণা আমাদের সতর্ক হওয়ার যথেষ্ট কারণ দিয়েছে। এখন প্রয়োজন অনুমান নয়, নিয়মিত পরীক্ষা; আতঙ্ক নয়, বৈজ্ঞানিক তথ্য; আর শুধু ব্যক্তিগত সচেতনতা নয়, শিল্প ও রাষ্ট্রের কার্যকর দায়িত্বশীলতা।
মানুষের স্বাস্থ্য রক্ষা করতে হলে রোগের চিকিৎসার পাশাপাশি রোগঝুঁকি তৈরির পরিবেশগত উৎসও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। কারণ, দূষণ প্রতিরোধ করা অনেক সময় তার দীর্ঘমেয়াদি পরিণতি মোকাবিলার চেয়ে সহজ ও কার্যকর।
