শিশুদের জন্য বিপজ্জনক ৩২ খাদ্যপণ্য বাজার থেকে তুলে নিতে আবদুল্লাহ আল মামুনের রিট

বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছে। গবেষণায় পরীক্ষা করা ৩২ ধরনের খাদ্যপণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই শিশুদের ক্যান্সারসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা পাওয়া গেছে। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রেও ৯টি খাদ্যপণ্যে স্বাস্থ্যঝুঁকি শনাক্ত হয়েছে।

এ ঘটনায় জনস্বার্থে হাইকোর্টে রিট আবেদন করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো. আবদুল্লাহ আল মামুন রিটটি দায়ের করেন। খাদ্য সচিব, স্বাস্থ্য সচিবসহ সংশ্লিষ্টদের রিটে বিবাদী করা হয়েছে। আগামী সপ্তাহে বিচারপতি খিজির আহমেদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন হাইকোর্ট বেঞ্চে রিটটির শুনানি হতে পারে।

গত ৮ সেপ্টেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ‘প্রক্রিয়াজাত খাবারেও ভারী ধাতু, বড় ঝুঁকিতে শিশুরা’ শীর্ষক প্রতিবেদনটি রিট আবেদনের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে।

গবেষণায় বাংলাদেশের বাজারে পাওয়া ৩২ ধরনের প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্য পরীক্ষা করে ছয় ধরনের ভারী ধাতুর উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। এগুলো হলো-সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেল। এসব ধাতুর ঘনত্ব নির্ধারণের পাশাপাশি খাবারের মাধ্যমে মানুষের শরীরে এগুলো প্রবেশের সম্ভাব্য মাত্রা এবং স্বাস্থ্যঝুঁকিও বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকরা যৌথভাবে গবেষণাটি করেন। গত ২২ আগস্ট আন্তর্জাতিক সাময়িকী Journal for Food Composition and Analysis-এ গবেষণাটি প্রকাশিত হয়।

বিস্কুট, রুটি ও বেকারি পণ্য

গবেষণায় পরীক্ষা করা বিস্কুট, রুটি ও বেকারি পণ্যের বেশির ভাগেই অনুমোদিত সীমার চেয়ে বেশি ক্রোমিয়াম ও সিসা পাওয়া গেছে।

একটি কোম্পানির বিস্কুটে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ১ দশমিক ২ গুণ এবং সিসা ২৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল। অন্য একটি কোম্পানির বিস্কুটে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৮ গুণ ও সিসা ২৯ দশমিক ৫ গুণ এবং আরেকটি বিস্কুটে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৩ গুণ ও সিসা ৪৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া যায়। রুটিতে ক্রোমিয়াম ৩ দশমিক ৬ গুণ এবং সিসা ৩১ দশমিক ৩ গুণ বেশি ছিল।

বেকারি পণ্যের মধ্যে ক্রিম রোলে দূষণের মাত্রা ছিল সবচেয়ে উদ্বেগজনক। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৭০ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ৩৫৭ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। ঘি টোস্টে ক্রোমিয়াম ৫ দশমিক ২ গুণ এবং টোস্টে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ২ গুণ ও নিকেল ২ গুণ বেশি ছিল।

কেকে ক্রোমিয়াম ও সিসার মাত্রাও ছিল অনুমোদিত সীমার অনেক ওপরে। একটি কোম্পানির কেকে ক্রোমিয়াম ১৮ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ১১৩ দশমিক ৩ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। অন্য একটি কেকে ক্রোমিয়াম ৪ দশমিক ২ গুণ ও সিসা ৩৫ দশমিক ১ গুণ এবং শুকনা কেকে ক্রোমিয়াম ৪ দশমিক ৯ গুণ ও সিসা ৪৫ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।

চানাচুরে ক্রোমিয়াম ৪ দশমিক ১ গুণ ও সিসা ৩০ দশমিক ৯ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। বিভিন্ন কোম্পানির চিপসে ক্রোমিয়াম ১ দশমিক ৫ থেকে ৭ দশমিক ৪ গুণ এবং সিসা ১০ দশমিক ২ থেকে ২৬ দশমিক ৩ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল। ঝালমুড়িতে ক্রোমিয়াম ৭ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ১০ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

ওয়েফারে একসঙ্গে চার ধরনের ভারী ধাতুর মাত্রা বেশি ছিল। এতে ক্রোমিয়াম ১১ দশমিক ৫ গুণ, নিকেল ২ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৪ গুণ এবং সিসা ১২ দশমিক ৯ গুণ বেশি পাওয়া যায়।

নুডলসে ক্রোমিয়াম ২ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ৪১ দশমিক ১ গুণ বেশি ছিল।

চকলেট ও দুধজাত পণ্যেও উদ্বেগ

চকলেটের কয়েকটি নমুনায় সিসা ও ক্রোমিয়ামের মাত্রা ছিল অত্যন্ত বেশি। দুধের চকলেটে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ৫৩ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ২৯৪ দশমিক ৯ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

একটি কোম্পানির বাদাম চকলেটে ক্রোমিয়াম ২ দশমিক ২ গুণ, তামা ১ দশমিক ৪ গুণ ও সিসা ১৪ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল। অন্য একটি চকলেটে ক্রোমিয়াম ৭ গুণ ও সিসা ১৩ দশমিক ৮ গুণ এবং আরেকটি চকলেটে ক্রোমিয়াম ১৩ দশমিক ৩ গুণ, নিকেল ৫ দশমিক ৪ গুণ ও সিসা ৩১ দশমিক ৬ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

দুধের গুঁড়ায় ক্রোমিয়াম ১২ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ২৫ গুণ বেশি ছিল। মল্টেড ড্রিংক পাউডারে ক্রোমিয়াম ১৩ দশমিক ৩ গুণ, নিকেল ৪ গুণ, তামা ৩ দশমিক ১ গুণ এবং সিসা ৫১ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

আইসক্রিম বারেও একাধিক ভারী ধাতুর মাত্রা অনুমোদিত সীমার ওপরে ছিল। এতে ক্রোমিয়াম ১৪ দশমিক ৯ গুণ, নিকেল ৪ গুণ এবং সিসা ৪১ দশমিক ৮ গুণ বেশি ছিল। কাপ আইসক্রিমে ক্রোমিয়াম ১৩ গুণ, নিকেল ৩ দশমিক ২ গুণ এবং সিসা ৩০ দশমিক ২ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

পানীয়তে সবচেয়ে বেশি দূষণ

গবেষণায় সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র পাওয়া গেছে বিভিন্ন ধরনের পানীয়তে। এসব পণ্যে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও সিসার মাত্রা কয়েক গুণ থেকে কয়েকশ গুণ পর্যন্ত বেশি ছিল।

ফলের পানীয়তে ক্রোমিয়ামের মাত্রা অনুমোদিত সীমার ২৮৩ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ১৪৭ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৭ গুণ এবং সিসা ৫৬৩ গুণ বেশি ছিল।

কফিতে ক্রোমিয়াম ৭৪ দশমিক ৪ গুণ, নিকেল ৩৯ দশমিক ৫ গুণ, তামা ১ দশমিক ৬ গুণ এবং সিসা ১৩৯ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। কমলার পানীয়তে ক্রোমিয়াম ৯১ দশমিক ২ গুণ, নিকেল ৮৮ গুণ এবং সিসা ১০৯ গুণ বেশি ছিল।

একটি কোম্পানির পানীয়তে ক্রোমিয়াম ১৯৮ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ২৩৭ দশমিক ৫ গুণ, তামা ২ দশমিক ১ গুণ এবং সিসা ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে। অন্য একটি কোম্পানির পানীয়তে ক্রোমিয়াম ১৭৯ দশমিক ৮ গুণ, নিকেল ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ, তামা ২ গুণ এবং সিসা ১৭৬ দশমিক ৫ গুণ বেশি ছিল।

লিচুর পানীয়তে ক্রোমিয়াম ৪৩ দশমিক ৪ গুণ, নিকেল ৬১ গুণ, তামা ৬ দশমিক ৮ গুণ এবং সিসা ২২৯ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

তবে সবচেয়ে বেশি দূষণের চিত্র পাওয়া গেছে কৃত্রিম আমের পানীয়তে। এতে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ২৭৯ দশমিক ৬ গুণ, নিকেল ১৫১ গুণ, তামা ৪ দশমিক ৩ গুণ এবং সিসা ৫৯৪ গুণ বেশি ছিল।

অর্থাৎ ৩২টি খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সিসা পাওয়া গেছে কৃত্রিম আমের পানীয়তে—অনুমোদিত সীমার ৫৯৪ গুণ। এরপর ফলের পানীয়তে ৫৬৩ গুণ, ক্রিম রোলে ৩৫৭ গুণ এবং দুধের চকলেটে ২৯৪ দশমিক ৯ গুণ বেশি সিসা শনাক্ত হয়েছে।

ক্রোমিয়ামের ক্ষেত্রেও পানীয়গুলোতে উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ফলের পানীয়তে ক্রোমিয়াম অনুমোদিত সীমার ২৮৩ দশমিক ৬ গুণ এবং কৃত্রিম আমের পানীয়তে ২৭৯ দশমিক ৬ গুণ বেশি ছিল। নিকেলের ক্ষেত্রেও একটি কোম্পানির পানীয়তে অনুমোদিত সীমার ২৩৭ দশমিক ৫ গুণ এবং আরেকটি পানীয়তে ২৩৪ দশমিক ৫ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।

উৎপাদনপ্রক্রিয়াতেও নজরদারির তাগিদ

গবেষণার ভূমিকা অংশে বলা হয়েছে, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও প্যাকেটজাত করার বিভিন্ন পর্যায়ে ভারী ধাতু খাদ্যে প্রবেশ করতে পারে। কাঁচামাল, পানি, উৎপাদন পরিবেশ এবং প্যাকেটজাত করার উপকরণও দূষণের উৎস হতে পারে।

গবেষকদের মতে, শুধু বাজার থেকে খাদ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করাই যথেষ্ট নয়। খাদ্য উৎপাদনের পুরো প্রক্রিয়ায় ভারী ধাতুর সম্ভাব্য উৎস চিহ্নিত করে তা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

এদিকে গবেষণায় শিশুদের সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকির যে চিত্র উঠে এসেছে, তা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে কার্যকর নজরদারি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়টি এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ