আইন মানা ব্যবসায়ীদের স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ ভোক্তা অধিদপ্তরের

নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সুপারশপ, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।

সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল সাড়ে ১০টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ের সভাকক্ষে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (অতিরিক্ত সচিব) মো. জহিরুল ইসলাম।

সভায় অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) সেবাস্টিন রেমা, পরিচালক (কার্যক্রম ও গবেষণাগার) আতিয়া সুলতানা, পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মো. মাসুম আরেফিনসহ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া বিএসটিআই, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, এফবিসিসিআই, বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি ও কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর প্রতিনিধিরা সভায় অংশ নেন। বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় সুপারশপ, ব্যবসায়ী সমিতি এবং বাজারের পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায়ীরাও উপস্থিত ছিলেন। সভায় প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরাও অংশ নেন।

মতবিনিময় সভাটি অধিদপ্তরের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ ও ইউটিউব চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়।

স্বাগত বক্তব্যে অধিদপ্তরের পরিচালক (কার্যক্রম ও গবেষণাগার) আতিয়া সুলতানা বলেন, একটি দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তির অন্যতম প্রধান শর্ত হলো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারমূল্য স্থিতিশীল রাখা এবং পণ্যের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ চেইন বজায় রাখা। বিশ্বায়ন ও নানামুখী অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে স্বচ্ছ, জবাবদিহিতামূলক ও ভোক্তাবান্ধব বাজারব্যবস্থা গড়ে তুলতে সবার সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন।

অধিদপ্তরের ঢাকা বিভাগীয় কার্যালয়ের উপপরিচালক নয়ন কুমার সাহা মাঠপর্যায়ের বাজার তদারকির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে বলেন, বাজার তদারকির সময় অনেক ব্যবসায়ীর মূল্যতালিকা প্রদর্শন ও ক্রয়রশিদ সংরক্ষণে অনীহা দেখা যায়। তিনি ব্যবসায়ীদের নৈতিকতা বজায় রেখে নকল ও ভেজাল পণ্য বাজারজাতকরণে সহযোগিতা না করার আহ্বান জানান।

মুক্ত আলোচনায় বিভিন্ন বাজার সমিতির প্রতিনিধিরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে পরিবহন খাতের বিভিন্ন অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার বিষয়টি তুলে ধরেন। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সমস্যা যাচাইয়ে থানাভিত্তিক টিম গঠন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির প্রতিনিধিদের সম্পৃক্ত করে বাজার তদারকি ও অভিযান পরিচালনার প্রস্তাব দেওয়া হয়।

এ সময় বাজারে অবৈধ মজুতদারি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি প্রতিরোধে ব্যাপক জনসচেতনতা সৃষ্টি এবং সম্মিলিত উদ্যোগ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

ক্যাবের সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল ও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সুষ্ঠু পরিবহনব্যবস্থা নিশ্চিত, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমানো, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

সভায় বিভিন্ন দপ্তরের প্রতিনিধিরা বলেন, শুধু আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এজন্য ভোক্তা ও ব্যবসায়ী—উভয় পক্ষের সচেতনতা, দায়িত্বশীলতা ও নৈতিকতার চর্চা প্রয়োজন। ব্যবসায়ীদের নকল ও ভেজাল পণ্য সরবরাহ থেকে বিরত থাকা, পণ্যের নির্ভরযোগ্য উৎস নিশ্চিত করা এবং ব্যবসায়িক কার্যক্রমে সততা বজায় রাখার আহ্বান জানানো হয়।

একই সঙ্গে সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স বাতিলের কথা সভায় জানানো হয়।

অধিদপ্তরের পরিচালক (অভিযোগ ও তদন্ত) মো. মাসুম আরেফিন বলেন, ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অধিদপ্তরের নিয়মিত বাজার তদারকি ও অভিযানের ফলে সুপারশপসহ বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বিদ্যমান অনিয়মের উল্লেখযোগ্য সংশোধন হয়েছে। একই সঙ্গে ভোক্তাদের মধ্যে অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতনতাও বেড়েছে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সমুন্নত রাখতে ন্যায্যতা নিশ্চিতের মাধ্যমে বাজার স্থিতিশীল রাখা সবার দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে জরিমানা আরোপই মুখ্য বিষয় নয়; বরং বাজার পরিস্থিতি যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি আরও বলেন, ভোক্তা ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় থাকলে আইন প্রয়োগের প্রয়োজনীয়তা অনেকাংশে কমে আসে। এ জন্য ভোক্তা অধিকার বিষয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানান তিনি।

মহাপরিচালক জানান, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে ইতিবাচক ভূমিকা পালনকারী এবং প্রচলিত নীতিমালা ও আইন মেনে ব্যবসা পরিচালনাকারী ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে যথাযথ স্বীকৃতি ও সনদ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে। তিনি বাজার ব্যবস্থাপনায় সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দায়িত্বশীল ও সমন্বিত ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।

সভাপতির বক্তব্যে পরিচালক (প্রশাসন ও অর্থ) সেবাস্টিন রেমা বলেন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে শুধু আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়; মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ও দায়িত্বশীল আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আনাও জরুরি। ব্যবসায়ী ও ভোক্তা একে অপরের পরিপূরক।

তিনি বলেন, সুশৃঙ্খল ও ভোক্তাবান্ধব বাজারব্যবস্থা নিশ্চিত করতে ব্যবসায়ীদের যথাযথভাবে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, সঠিক ওজন ও পরিমাপ নিশ্চিত এবং ক্রয়-বিক্রয়ের রশিদ সংরক্ষণ করতে হবে। একই সঙ্গে ভোক্তাদেরও নিজেদের অধিকার ও দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে ব্যবসায়ী ও ভোক্তা উভয় পক্ষকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

সূত্র: জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ