কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলা: মাইক্রোপ্লাস্টিকস ধ্বংসে আয়রার অভিনব উদ্ভাবন

মাত্র ১৮ বছর বয়সেই পরিবেশের অন্যতম বড় সংকট প্লাস্টিক দূষণ মোকাবিলায় নতুন সমাধান নিয়ে এগিয়ে এসেছেন আয়ারল্যান্ডের শিক্ষার্থী আয়রা সতীশ। তাঁর উদ্ভাবিত পচনশীল বা বায়োডিগ্রেডেবল প্লাস্টিক ‘ইকো পার্জ’ মাটিতে বা পানিতে পচে যাওয়ার সময় এমন এনজাইম ছড়িয়ে দেয়, যা আশপাশের ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকস ভেঙে নষ্ট করতে সাহায্য করে।

নিজের এই গবেষণা নিয়ে চলতি বছরের মে মাসে ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সীদের জন্য আয়োজিত বৈশ্বিক পরিবেশ প্রতিযোগিতা ‘দ্য আর্থ প্রাইজ’-এ অংশ নেন আয়রা। সেখানে তিনি ইউরোপের সেরা হিসেবে বিজয়ী হন এবং পুরস্কার হিসেবে পান ১২ হাজার ৫০০ ডলার।

স্কুলে পড়ার সময় আয়রা আয়ারল্যান্ডের ইউসিডি ডাবলিন, এটিইউ লেটারকেনি এবং বায়োঅর্বিক রিসার্চ সেন্টারের গবেষকদের সঙ্গে ‘ইকো পার্জ’ প্রকল্পে কাজ করেন।

মাইক্রোপ্লাস্টিকস দূর করার নতুন পথ

২০২৬ সালের ‘আর্থ প্রাইজ’ বিজয়ী আয়রা সতীশ ভবিষ্যতে বায়োটেকনোলজিতে পিএইচডি করার স্বপ্ন দেখেন। পানি পরীক্ষার কাজ করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন, প্লাস্টিকের অতিক্ষুদ্র কণাগুলো বা মাইক্রোপ্লাস্টিকস দূর করা অত্যন্ত কঠিন। এসব ক্ষতিকর কণা খাওয়ার পানিতেও মিশে যাচ্ছে।

এই সমস্যার সমাধানে উদ্ভিদ থেকে তৈরি করা হয় ‘ইকো পার্জ’ নামের বায়োপ্লাস্টিক। এর ভেতরে বিশেষ এনজাইম সংরক্ষিত থাকে। প্লাস্টিকটি মাটি বা পানিতে মিশে পচে যাওয়ার সময় এনজাইমগুলো বের হয়ে আসে এবং আশপাশের ক্ষতিকর মাইক্রোপ্লাস্টিকস ভেঙে নষ্ট করতে সাহায্য করে।

এই এনজাইম তৈরির জন্য আয়রা জিনে পরিবর্তন আনা বিশেষ ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করেছেন। গবেষণার প্রাথমিক খরচ বেশি হলেও ভবিষ্যতে এ পদ্ধতি সাশ্রয়ী হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।

পুরস্কার হিসেবে পাওয়া ১২ হাজার ৫০০ ডলারের একটি অংশ তিনি ল্যাবে ব্যাকটেরিয়া নিয়ে গবেষণায় ব্যবহার করবেন। গবেষণা সফল হলে বাকি অর্থ দিয়ে বড় পরিসরে প্লাস্টিক উৎপাদনের পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।

ইউরোপের প্লাস্টিক সংকট মোকাবিলার ভাবনা

আয়রা সতীশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

তাঁর মতে, শুধু প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে এই সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। কারণ, প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ২৪ কোটি টন প্লাস্টিক তৈরি হলেও এর মাত্র ৯ শতাংশ পুনর্ব্যবহার করা যায়।

এ ছাড়া তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসা ধরে রাখতে নিত্যদিনের হাজারো পণ্যে প্লাস্টিকের কাঁচামাল ব্যবহার করে থাকে।

আয়রার মতে, বর্জ্য না বাড়িয়ে পরিবেশবান্ধব ও পচনশীল প্লাস্টিকের ব্যবহার বাড়ানো এখন অনেক বেশি প্রয়োজন।

এখনো রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জ

আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেলেও ‘ইকো পার্জ’ প্রযুক্তি এখনো পরীক্ষামূলক পর্যায়ে রয়েছে। এর এনজাইম প্রধানত পিইটি ধরনের প্লাস্টিক ধ্বংস করতে পারে। ফলে সব ধরনের প্লাস্টিক এ প্রযুক্তির মাধ্যমে নষ্ট করা সম্ভব নয়।

এ ছাড়া সাধারণ পরিবেশে মাটির সঙ্গে মিশে যাওয়ার কারণে এনজাইমগুলোর কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে।

আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো প্লাস্টিক তৈরির কারখানায় ব্যবহৃত উচ্চ তাপমাত্রা। এতে এনজাইমগুলো নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা কম খরচে ‘ইকো পার্জ’ উৎপাদনকে কঠিন করে তুলতে পারে।

এই সমস্যাগুলোর সমাধানে আগামী পাঁচ বছর গবেষণা চালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আয়রার। ভবিষ্যতে প্যাকেজিং, কম্পোস্ট ব্যাগ এবং আবর্জনার ব্যাগ তৈরিতে ‘ইকো পার্জ’ ব্যবহারের পরিকল্পনা করছেন তিনি।

সূত্র: ইউরো নিউজ

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ