
শবনম মোস্তফা
আমরা কি খাচ্ছি, সেটা জানা আমাদের অধিকার। তবে বাংলাদেশে প্যাকেটজাত খাবারের পেছনে থাকা তথ্য এতটাই জটিল, অস্পষ্ট বা দুর্বোধ্য যে একজন ভোক্তার পক্ষে তাৎক্ষণিকভাবে বুঝে কেনাকাটার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কঠিন।
তাহলে প্রশ্ন—এই তথ্য কি সত্যিই ভোক্তার সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণে কোনো ভূমিকা রাখছে, নাকি এটি কেবল তথ্য প্রকাশের আনুষ্ঠানিকতা? ‘তথ্য থাকা’ এবং ‘তথ্য বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারা’ এক বিষয় নয়। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণভাবে ভোক্তা এক প্যাকেট খাবার কিনতে কয়েক মিনিট, কখনো বা কয়েক সেকেন্ড সময় নেয়। এই অল্প সময়ের মধ্যেই তাকে ভাবতে হয়, পণ্যটিতে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা ক্ষতিকর চর্বি আছে কি না, এবং থাকলে সেটা স্বাস্থ্যের জন্য কতটা উদ্বেগের।
প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে লেখা জটিল পুষ্টিতথ্য একজন ভোক্তার জন্য কতটা সহজবোধ্য? ভোক্তার পক্ষে কি একই সময়ে একাধিক পণ্যের তথ্য তুলনা করে স্বাস্থ্যসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ সম্ভব? এসব প্রশ্নের সহজ সমাধান প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তা হিসেবে ফ্রন্ট-অব-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল)-এর প্রচলন।
বাংলাদেশের খাদ্যব্যবস্থায় অতিপ্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের বাজার ক্রমবর্ধমানভাবে বাড়ছে এবং একই সঙ্গে বাড়ছে খাদ্যজনিত অসংক্রামক রোগের প্রকোপ। ২০২৫ সালে দেশব্যাপী পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার গ্রহণ করে থাকে। একই গবেষণায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ১৪টি খাদ্য ক্যাটাগরির আওতায় বিশ্লেষণ করা ১০৫টি প্রক্রিয়াজাত ও অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ৬৩ শতাংশে উচ্চমাত্রায় লবণের (সোডিয়াম) উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
দেশের স্বাস্থ্য পরিসংখ্যানেও এর প্রভাব স্পষ্ট।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, দেশে প্রতিবছর প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজার ২৬৩ জন মানুষের মৃত্যুর জন্য বিভিন্ন অসংক্রামক রোগ দায়ী, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশ। প্রায় ১ কোটি ৩৯ লাখ মানুষ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত এবং প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি ৪ জনে ১ জন (প্রায় ২৩.৫%) উচ্চ রক্তচাপে ভুগছে। অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এই পরিস্থিতি সৃষ্টির পিছনে ব্যাপকভাবে দায়ী। কাজেই খাদ্যপ্যাকেটে শুধু তথ্য দিলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, তথ্যটি যেন ভোক্তা সহজে বুঝে সচেতন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে।
প্যাকেটের সামনে সহজ সতর্কবার্তা হিসেবে ফ্রন্ট-অফ-প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) এক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ। এই ব্যবস্থায় কোনো খাদ্যপণ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ এবং সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে তা প্যাকেটের সামনেই স্পষ্ট সতর্কীকরণ চিহ্নের মাধ্যমে জানানো হয়ে থাকে। এটি ভোক্তাকে দৃশ্যমান, সহজ ও বোধগম্য তথ্য দেয় এবং সচেতন খাদ্য-সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়তা করে।
বর্তমানে বিশ্বের ৪৪টি দেশে এফওপিএল চালু রয়েছে, যার মধ্যে চিলি, মেক্সিকো, উরুগুয়েসহ ১০টি দেশে বাধ্যতামূলক সতর্কীকরণ এফওপিএল ব্যবস্থা। এফওপিএল প্রচলনের পর চিলিতে ‘অতিরিক্ত’ সতর্কবার্তা প্রয়োজন এমন পণ্যের হার কমেছে, এবং অতিরিক্ত চিনি, সোডিয়াম ও অস্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত পণ্যের ক্রয়েও উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা গেছে। উরুগুয়ের অভিজ্ঞতায় অধিকাংশ ভোক্তা সতর্কীকরণ লেবেল লক্ষ্য করেছেন এবং উল্লেখযোগ্য অংশ ক্রয় সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের কথা জানিয়েছেন। অর্থাৎ, সহজ সতর্কীকরণভিত্তিক লেবেলিং ক্রমবর্ধমানভাবে একটি প্রমাণভিত্তিক জনস্বাস্থ্য নীতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে।
বাংলাদেশের সংবিধানের ১৮(১) অনুচ্ছেদে জনগণের পুষ্টির স্তর উন্নয়ন এবং জনস্বাস্থ্যের উন্নতিকে রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩-তে মানুষের জীবন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং খাদ্য লেবেলিংয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রতিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। বাংলাদেশের তথ্য অধিকার আইনেও তথ্যের অবাধ প্রবাহ এবং জনগণের তথ্য অধিকার নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। সুতরাং, খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ভোক্তার স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও জানার অধিকারকে নিশ্চিত করতে বোধগম্য উপায়ে প্যাকেটের গায়ে তথ্য মুদ্রণ জরুরি। খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা সম্পৃক্ত চর্বি থাকলে এফওপিএলের মাধ্যমে তা স্পষ্টভাবে ভোক্তার সামনে উপস্থাপন করতে হবে।
বাংলাদেশ এফওপিএল প্রচলনের পথে অনেকটাই অগ্রসর হয়েছে। ইতিমধ্যে, সরকারের নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা, ২০২৬’-এর খসড়া প্রণয়ন করেছে, যেখানে অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও সম্পৃক্ত চর্বির ক্ষেত্রে প্যাকেটের সামনের অংশে কালো অষ্টভুজাকৃতির সতর্কীকরণ লেবেল প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। খসড়াটি জনমত যাচাই শেষে পরবর্তী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় খসড়াটি দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, এফওপিএল ব্যবস্থা প্রচলনের সময় খাদ্য শিল্প নানা উপায়ে এটি দুর্বল ও বিলম্ব করার চেষ্টা করে। বাংলাদেশেও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধি, প্রযুক্তিগত মান ও অর্থনৈতিক প্রভাবের যুক্তি তুলে ধরে এফওপিএল প্রণয়ন বিলম্ব ও শিথিলে চাপ সৃষ্টি করছে খাদ্য শিল্পখাত সংশ্লিষ্টরা। ‘বাধ্যতামূলক’-এর পরিবর্তে ‘স্বেচ্ছামূলক’ এফওপিএল, দীর্ঘ বাস্তবায়নকাল, ছোট প্যাকেট অব্যাহতিসহ বিভিন্ন দাবি জোরালো করছে তারা। তবে সরকার বৈশ্বিকভাবে স্বীকৃত, প্রমাণভিত্তিক, বাধ্যতামূলক ও জনস্বাস্থ্যকেন্দ্রিক এফওপিএল বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর, যা অত্যন্ত প্রশংসনীয়।
অসংক্রামক রোগের নীরব মহামারী প্রতিরোধে এফওপিএল সংক্রান্ত খসড়া প্রবিধানমালা দ্রুত চূড়ান্ত করে একটি একক, শক্তিশালী ও স্পষ্ট এফওপিএল চালু করা এখন সময়ের দাবি।
লেখক: প্রোগ্রাম অফিসার, প্রজ্ঞা (প্রগতির জন্য জ্ঞান)
সূত্র: কালের কণ্ঠ
