ক্ষুধার পৃথিবীতে এক ভয়াবহ বৈপরীত্য: বছরে ১০০ কোটির বেশি টন খাবার অপচয়, দায় কার?

বিশ্বে একদিকে বাড়ছে জনসংখ্যা, অন্যদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, খাদ্য উৎপাদনের বাড়তি চাপ ও ক্রমবর্ধমান খাদ্য সংকট। এর মধ্যেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ খাবার মানুষের খাবার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার আগেই কিংবা ব্যবহারের পর নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।

একটি খাবার নষ্ট হওয়ার সঙ্গে শুধু খাবারই নষ্ট হয় না। এর সঙ্গে অপচয় হয় সেই খাবার উৎপাদনে ব্যবহৃত পানি, জমি, শ্রম, জ্বালানি ও অর্থেরও। আর নষ্ট হওয়া খাবার যখন আবর্জনার স্তূপে গিয়ে পচে, তখন সেখান থেকে নির্গত গ্রিনহাউস গ্যাস জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দেয়।

এই বাস্তবতায় খাদ্য অপচয় রোধকে বৈশ্বিক খাদ্য সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে।

‘খাদ্য ক্ষতি ও অপচয় হ্রাসের রূপান্তরকারী সম্ভাবনা’ এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বাংলাদেশে আজ যথাযথ মর্যাদায় পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক খাদ্য অপচয় ও ক্ষতি সচেতনতা দিবস। প্রতি বছর ২৯ সেপ্টেম্বর বিশ্বব্যাপী দিবসটি পালিত হয়।

বাংলাদেশে কতটা খাবার অপচয় হয়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ খাদ্য অপচয় হয়। দেশে মাথাপিছু খাদ্য অপচয়ের পরিমাণ প্রায় ৮২ কেজি।

তবে খাদ্য অপচয়ের গল্প শুধু খাবার টেবিল বা রান্নাঘরেই শেষ হয় না। ফসল কাটার সময়, পরিবহন, সংরক্ষণ, ত্রুটিপূর্ণ কোল্ড চেইন এবং বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপেও বিপুল পরিমাণ খাদ্য নষ্ট হয়। এই পর্যায়ের ক্ষতিকে বলা হয় ‘খাদ্য ক্ষয়’।

অর্থাৎ, কৃষকের মাঠ থেকে শুরু করে ভোক্তার খাবার টেবিল পর্যন্ত পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার বিভিন্ন ধাপেই খাবার হারিয়ে যাচ্ছে।

বিশ্বের চিত্র আরও উদ্বেগজনক

জাতিসংঘের পরিবেশ কর্মসূচি (ইউএনইপি) এবং খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বে উৎপাদিত মোট খাদ্যের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ নষ্ট বা অপচয় হয়।

চূড়ান্ত ভোক্তা পর্যায়ে অর্থাৎ বাসাবাড়ি, রেস্তোরাঁ ও খুচরা বিক্রেতার কাছে পৌঁছানোর পর, সরবরাহ করা খাবারের প্রায় ১৯ শতাংশ বা ১০০ কোটি টনেরও বেশি খাবার সরাসরি অপচয় হয়। এর পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ০৫ বিলিয়ন টন।

এই অপচয়ের পরিমাণকে দৈনিক হিসাবে ধরলে বিশ্বজুড়ে প্রতিদিন ১০০ কোটিরও বেশি বেলার খাবার ডাস্টবিনে চলে যায়।

অন্যদিকে, ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর আগেই ফসল কাটার পর থেকে বাজারজাতকরণের বিভিন্ন ধাপে আরও প্রায় ১৩ শতাংশ খাদ্য নষ্ট হয়ে যায়।

সবচেয়ে বেশি অপচয় কোথায়?

খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বড় অংশ ঘটে এমন জায়গায়, যেখানে আমরা হয়তো বিষয়টিকে সবচেয়ে কম গুরুত্ব দিই, নিজেদের বাসাবাড়িতে।

বিশ্বব্যাপী মোট খাদ্য অপচয়ের প্রায় ৬০ শতাংশই ঘটে বাসাবাড়িতে। এর পরিমাণ প্রায় ৬৩ কোটি ১০ লাখ টন। রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যাফেটেরিয়া ও বিয়েবাড়ির মতো খাদ্য পরিষেবা খাতে অপচয় হয় প্রায় ২৮ শতাংশ খাবার। আর সুপারশপ, মুদি দোকান ও কাঁচাবাজারের মতো খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রে অপচয় হয় প্রায় ১২ শতাংশ। অর্থাৎ, খাদ্য অপচয়ের বড় একটি অংশ কোনো শিল্পকারখানায় নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপন ও ভোগের অভ্যাসের সঙ্গেই জড়িয়ে আছে।

একজন মানুষ বছরে কত খাবার নষ্ট করেন?

বিশ্বে একজন মানুষ গড়ে প্রতি বছর প্রায় ৭৯ কেজি খাবার অপচয় করেন।

একজন মানুষের কাছে ৭৯ কেজি খাবার হয়তো এক বছরের একটি সংখ্যা। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষের ক্ষেত্রে এই ছোট ছোট অপচয়ই একসময় বিশাল খাদ্য অপচয়ে পরিণত হয়।

আর এর অর্থনৈতিক মূল্যও কম নয়। বিশ্বে খাদ্য অপচয়ের কারণে প্রতি বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়।

খাবার নষ্ট মানে শুধু খাবার নষ্ট নয়

একটি খাবার যখন ডাস্টবিনে যায়, তখন তার সঙ্গে হারিয়ে যায় আরও অনেক কিছু। সেই খাবার উৎপাদনে যে পানি ব্যবহার হয়েছে, যে জমিতে ফসল ফলেছে, কৃষকের যে শ্রম ব্যয় হয়েছে, পরিবহনে যে জ্বালানি খরচ হয়েছে এবং পুরো প্রক্রিয়ায় যে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে, খাবারটি নষ্ট হওয়ার সঙ্গে এসব সম্পদেরও একটি অংশ অপচয় হয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় পরিবেশগত ক্ষতি। খাবার পচে গেলে তা থেকে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে।

২০৩০ সালের লক্ষ্য

টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা বা এসডিজির ১২ দশমিক ৩ নম্বর লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে খুচরা ও ভোক্তা পর্যায়ে মাথাপিছু খাদ্য অপচয় অর্ধেকে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

এই লক্ষ্য অর্জনে খাদ্য সরবরাহ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে উদ্বৃত্ত খাবারের দ্রুত বাজারজাতকরণ, মোবাইল খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ব্যবস্থার প্রবর্তন এবং আধুনিক কোল্ড চেইন অবকাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন পরিবেশবিদ ও গবেষকরা।

কারণ, অনেক ক্ষেত্রে খাবার নষ্ট হওয়ার কারণ খাবারের অভাব নয়; বরং সঠিক সময়ে সঠিক জায়গায় খাবার পৌঁছাতে না পারা, যথাযথভাবে সংরক্ষণ করতে না পারা কিংবা চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে সমন্বয় না থাকা।

একদিকে ক্ষুধা, অন্যদিকে অপচয়

খাদ্য অপচয়ের সবচেয়ে বেদনাদায়ক দিকটি এখানেই। বিশ্বের একদিকে যখন প্রায় ৭৮ কোটির বেশি মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে এবং প্রতিদিন অনাহারে ঘুমাতে যাচ্ছে, অন্যদিকে বিপুল পরিমাণ খাবার প্রতিনিয়ত নষ্ট হচ্ছে।

এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক বা পরিবেশগত সংকটের কথা বলে না; এটি আমাদের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ও ভোগের অভ্যাস নিয়েও বড় প্রশ্ন তোলে।

খাদ্য অপচয় রোধ তাই শুধু বেশি খাবার বাঁচানোর বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষকের শ্রমের মূল্য, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের খাদ্যনিরাপত্তা।

একটি খাবার কম অপচয় করা হয়তো একা পৃথিবী বদলে দেবে না। কিন্তু কোটি কোটি মানুষ যদি প্রতিদিনের ছোট ছোট অপচয় কমিয়ে দেয়, তাহলে সেই সম্মিলিত পরিবর্তনই হয়ে উঠতে পারে বড় সমাধানের অংশ।

খাবার যতটা প্রয়োজন, ততটাই নেওয়া, আজকের এই ছোট অভ্যাসই হয়তো আগামী দিনের খাদ্যনিরাপত্তার জন্য বড় পদক্ষেপ।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ