
২০১৪ সালের ১৩ জুন গাবতলীতে সাভারের সহকারী কমিশনার লিয়াকত আলীর ভ্রাম্যমাণ আদালত ১০০ টন আম, ১০০ ঝুড়ি লিচু, ২০ মণ জাম এবং ৪ টন পেঁপে ধ্বংস করে।
আদালত জানায়, আমে গড়ে ১৪৩ পিপিএম ফরমালিন পাওয়া গেছে।
এই সংখ্যা এসেছিল হাতে ধরা মিটার থেকে, নাম ফরমালডিহাইড মিটার জেড-৩০০। মিটারটা বানানো হয়েছে বাতাসে ফরমালডিহাইড আছে কিনা দেখার জন্য, ফলের ভেতরে কী আছে দেখার জন্য না।
ফরমালিন লাশ পচা ঠেকানোর রাসায়নিক, ফলে মানুষ এটাকে ভয় পায়। সেই ভয়ের ওপর ভর করে রাষ্ট্র চেকপোস্ট বসিয়েছে, আইন করেছে, ট্রাকভর্তি ফল নষ্ট করেছে।
এই লেখায় দুইটা জিনিস পাশাপাশি দেখা হবে।
প্রথমত ফরমালিনের ভয়। দশ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মানুষ খাবারে সবচেয়ে বেশি ভয় পেয়েছে ফরমালিনকে, অথচ সেই ভয় তৈরি হয়েছিল এমন এক মিটারের রিডিং থেকে, যেটা খাবার পরীক্ষার জন্য বানানো হয় নাই।
দ্বিতীয়ত এমন দূষণ, যা নিয়ে মানুষের ভয় কম, কিন্তু ল্যাবের পরীক্ষায় বারবার ধরা পড়েছে।
২০২৬ সালে ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বাজারের চালের প্রতি পাঁচটা নমুনার একটায় আন্তর্জাতিক সীমার বেশি আর্সেনিক পেয়েছে, এবং একই বছর ছাপা এক গবেষণায় খামার ও বাজারের মুরগির প্রতি সাতটা নমুনার একটায় অ্যান্টিবায়োটিক নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছে।
হলুদে সীসা, দুধে অ্যান্টিবায়োটিক এবং সবজিতে সীমার বেশি কীটনাশকের প্রমাণও গবেষণায় ছাপা হয়েছে।
এসব হিসাবের বেশিরভাগ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয় ও বিদেশি অনুদানের গবেষণা থেকে, এবং চালের যে পরীক্ষা সরকারি ল্যাবে হয়েছে, সেটাও ছিল এককালীন পাইলট।
আমরা প্রতিদিন যে ভাত, দুধ, মুরগি ও সবজি খাই, তাতে কী আছে, প্রতি বছর পরীক্ষা করে সেই প্রশ্নের উত্তর মানুষকে জানানোর ব্যবস্থা রাষ্ট্র এখনো করে নাই।
➖
২০১২ সালের শুরুতে মৎস্য অধিদপ্তর এক কোটি টাকায় আমেরিকার এনভায়রনমেন্টাল সেন্সরস কোম্পানির ৮০টা জেড-৩০০ মিটার কিনে প্রতিটা বিভাগ ও জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের জন্য পাঠিয়ে দেয়।
দেখাদেখি ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই, ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরও একই মিটার কিনে।
পরীক্ষার পদ্ধতি ছিল সহজ। ফল পলিথিনে ভরে কিছুক্ষণ রাখা, তারপর ব্যাগের ভিতরের বাতাসে মিটার ধরা। মিটারে সংখ্যা উঠলে ফরমালিন, না উঠলে নিরাপদ।
২০১৪ সালের আমের মৌসুমে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এই পদ্ধতি নিয়ে ১১ জুন থেকে শহরের আটটা প্রবেশমুখে চেকপোস্ট বসায়, এবং পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়, ফরমালিন দিয়ে ধীরে ধীরে মানুষ মারা হচ্ছে। ওই রমজানে ফল আমদানিকারকদের বিক্রি ৮০ শতাংশ পড়ে যায়।
২০১৪ সালের ১৩ জুলাই বাংলাদেশ খাদ্যপণ্য আমদানিকারক সমিতি হাইকোর্টে রিট করে। শুনানির পর আদালত বিসিএসআইআর, বিএসটিআই ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবকে মিটারটা পরীক্ষা করে প্রতিবেদন দিতে বলে।
২৩ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ, বিসিএসআইআর, প্রতিবেদন জমা দেয়। তাদের বিজ্ঞানীরা ভ্রাম্যমাণ আদালতের পদ্ধতিই অনুসরণ করেছিলেন, ফল ফরমালিনে ডুবিয়ে শুকিয়ে পলিথিনে ভরেছেন, পাশে রেখেছেন গাছের তাজা ফল।
দেখা যায়, গরমে রাখলে তাজা ফলেও মিটারের সংখ্যা উঠতে থাকে। সময়, তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা বদলালে সংখ্যা বদলায়, এবং অ্যাসিটোন, ফরমিক অ্যাসিড, অ্যাসেটিক অ্যাসিড বা মিথানল থাকলেও মিটার ফরমালডিহাইড দেখাতে পারে।
বিসিএসআইআর আদালতকে এটাও জানায়, প্রস্তুতকারক কোম্পানির কাগজপত্রে খাবার পরীক্ষায় এই মিটার ব্যবহারের কোনো নির্দেশনা নাই।
ফলের ভেতরে প্রাকৃতিকভাবেও ফরমালডিহাইড থাকে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার হিসাব তুলে ধরে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক এম এ রহিম জানান, আমে এর মাত্রা ১.২২ থেকে ৩.০৮ পিপিএম।
২৪ নভেম্বর বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী ও বিচারপতি এম খসরুজ্জামানের বেঞ্চ দুই মাসের মধ্যে ফলের ফরমালিন শনাক্তের উপযোগী কিট কিনতে বলে।
উপযোগী কিট মানে এমন কিট, যা ফলের নিজের ফরমালডিহাইড এবং বাইরে থেকে মেশানো ফরমালিন আলাদা করতে পারে। কোন কিট কেনা হবে তা ঠিক করতে আদালত এক সপ্তাহের মধ্যে বিশেষজ্ঞ কমিটি করার নির্দেশ দেয়।
আদালতের নির্দেশের পাঁচ বছর পর, ২০১৯ সালে, বাংলা ট্রিবিউন লেখে, খাবারে ফরমালিন পরীক্ষার সঠিক কিট তখনো কেনা হয় নাই।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের পুষ্টি বিভাগের পরিচালক মো. মনিরুল ইসলাম পরে বলেন, ফলের ফরমালডিহাইড প্রাকৃতিক নাকি বাইরে থেকে মেশানো, তা বোঝার সহজ কোনো উপায় দেশে নাই, এর জন্য ল্যাবে কয়েক ধাপের পরীক্ষা লাগে।
বাজারে দাঁড়িয়ে ফলে ফরমালিন ধরার যে পদ্ধতিতে ২০১৪ সালে টন টন ফল নষ্ট হয়েছিল, সেই পদ্ধতির কোনো নির্ভরযোগ্য বিকল্প দশ বছরেও দাঁড়ায় নাই।
➖
মিটার ভুল প্রমাণিত হওয়ার পাঁচ মাসের মাথায়, ২০১৫ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি, সংসদে ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন পাস হয়। লাইসেন্স ছাড়া ফরমালিন আমদানি, তৈরি বা মজুত করলে সাজা যাবজ্জীবন পর্যন্ত জেল এবং ৫ থেকে ২০ লাখ টাকা জরিমানা।
২০১৬ সালের এপ্রিলে ডেইলি স্টারের আইনবিষয়ক পাতায় ছাপা এক লেখায় বলা হয়, চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া কোনো মামলায় তখনো কোনো খাদ্যবিক্রেতার সাজা হয় নাই।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞরা বলছিলেন, ফলে ফরমালিন মেশানোর ধারণাটাই রসায়নে টিকে না। ফরমালিন কাজ করে প্রোটিনের সঙ্গে, এই কারণে লাশে বা মাছে কাজ করে। আম, লিচু, শসায় প্রোটিন প্রায় নাই, ফলে সেখানে মেশালেও কিছু হয় না, ফল আগের মতোই পচে।
২০১৫ সালের ৩১ মার্চ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার খাদ্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা শ্রীধর ধর্মপুরি ঢাকায় বলেন, ফরমালিন মূলত কারখানার শ্রমিকের ঝুঁকি, খাবারের না।
২০১৭ সালের আগস্টে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মাহফুজুল হক নিজেই বলেন, অভিযানে ব্যবহার করা কিটগুলো ত্রুটিপূর্ণ ছিল, এবং আপেলে প্রাকৃতিকভাবেই ২৩ পিপিএম পর্যন্ত ফরমালডিহাইড থাকে।
কর্তৃপক্ষ পরে গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, ফল এবং সবজিতে কেজিতে গড়ে ৩ থেকে ৬০ মিলিগ্রাম ফরমালডিহাইড প্রকৃতিগতভাবে থাকে।
২০২২ সালের ৬ জুলাই খাদ্যসচিব মো. ইসমাইল হোসেন এক অনুষ্ঠানে বলেন, ফরমালিন আছে ভেবে একসময় ট্রাকে ট্রাকে মাছ, শাকসবজি ও ফল ধ্বংস করা হয়েছে, এবং এত দিন পরে তিনি শুনছেন, শনাক্ত করার মিটারেই গলদ ছিল।
মাছের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা খোলা রয়ে গেছে। মাছে প্রোটিন আছে, তাই আম-লিচুর মতো মাছে ফরমালিন অকেজো না। কিন্তু মাঠের কিট দিয়ে মাছের নিজের ফরমালডিহাইড এবং বাইরে থেকে মেশানো ফরমালিন আলাদা করা যায় না, ফলে মাছে ফরমালিনের অভিযোগ প্রমাণিতও হয় নাই, বাতিলও হয় নাই।
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ফুড সিকিউরিটি জার্নালে ছাপা ঢাকার বস্তির ৪৪৪ পরিবারের জরিপে খাবার নিয়ে মানুষের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা এখনো ফরমালিন। খাবার থেকে অসুখের প্রধান কারণ জীবাণু, অথচ জীবাণুর কথা প্রায় কেউ বলেন নাই।
মিটার ভুল প্রমাণিত হওয়ার দশ বছর পরেও মানুষের প্রধান খাদ্যভয় সেই ফরমালিন, যার ভিত্তি ছিল ভুল মিটারের রিডিং।
➖
ফলের বেলায় ফরমালিনের অভিযোগ এসেছিল মিটার থেকে, এবং ল্যাবের পরীক্ষায় সেই মিটার ভুল প্রমাণিত হয়। দুধের বেলায় উল্টা, ২০১৯ সালে অ্যান্টিবায়োটিকের খবর প্রথম এসেছিল ল্যাব থেকে, পরে আরও কয়েকটা ল্যাবেও তা পাওয়া যায়।
এই খবরের পরবর্তী ছয় মাস ধরে সরকারি দপ্তরগুলো কী করেছে, দুধের ঘটনায় তা দেখা যায়।
২০১৯ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তা ল্যাবের অধ্যাপক শাহনীলা ফেরদৌসী দুধের গবেষণার ফল জানান। এই ল্যাব সরকারি, টাকা দিয়েছিল জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা, নমুনা নেওয়া হয়েছিল ২০১৮ সালের শেষ পাঁচ মাসে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ থেকে।
কাঁচা দুধের ৯৬টা নমুনার ১০টায় অ্যান্টিবায়োটিক টেট্রাসাইক্লিন, ৯টায় কীটনাশক, ৫টায় সীসা এবং ৩টায় ছত্রাকের বিষ অ্যাফলাটক্সিন পাওয়া যায়। ৯৩টা নমুনায় জীবাণুর মাত্রা ছিল সীমার বেশি। প্যাকেটের দুধের ৩১টা নমুনার ৯টায় টেট্রাসাইক্লিন সীমা ছাড়ায়।
একই গবেষণায় গরুর খাবারের ৩০টা নমুনার সবগুলোতে সিপ্রোফ্লক্সাসিন পাওয়া যায়, অথচ ২০১০ সালের পশুখাদ্য আইনে পশুর খাবারে অ্যান্টিবায়োটিক মেশানো নিষিদ্ধ।
পরদিন হাইকোর্ট বিষয়টা নিজে থেকে আমলে নিয়ে রুল জারি করে। এরপর কয়েকটা সরকারি প্রতিষ্ঠান শাহনীলা ফেরদৌসীর কাছে জানতে চায়, ভেজাল কাঁচা দুধ ও দই কোন কোন প্রতিষ্ঠানের, এবং তিনি কোন পদ্ধতিতে গবেষণা করেছেন।
২৩ জুন তার আইনজীবী আদালতকে জানান, এসব প্রশ্ন নিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো তাকে বিরক্ত করছে ও চাপ দিচ্ছে। আদালত সেদিন তাকে বিরক্ত না করার নির্দেশ দেয়, এবং লাইসেন্স ছাড়া দুধ ও দই বানানো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় বিএসটিআইয়ের সমালোচনা করে।
দুই দিন পর, ২৫ জুন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের কয়েকজন শিক্ষক অধ্যাপক আ ব ম ফারুকের নেতৃত্বে নিজেদের পরীক্ষার ফল জানান।
মিল্ক ভিটা, আড়ং, ফার্ম ফ্রেশ, প্রাণ ও ইগলুর সাতটা পাস্তুরিত দুধের নমুনার সবগুলোতে লেভোফ্লক্সাসিন ও সিপ্রোফ্লক্সাসিন এবং ছয়টায় অ্যাজিথ্রোমাইসিন পাওয়া যায়। খোলা দুধসহ চারটা নমুনায় ডিটারজেন্ট মিলে।
এই তিনটা ওষুধ ডাক্তাররা টাইফয়েড, নিউমোনিয়া ও প্রস্রাবের সংক্রমণে নিয়মিত দেন। দুধের সঙ্গে প্রতিদিন অল্প মাত্রায় শরীরে ঢুকলে ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে এগুলোর কাজ না করার ঝুঁকি বাড়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দল এই ফল জানিয়েছিল অনুষদের সভাকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে, জার্নালে ছাপা গবেষণা হিসেবে না। তাই দুধে অ্যান্টিবায়োটিক শনাক্ত হলেও মাত্রা নিরাপদ সীমা ছাড়িয়েছিল কিনা, এই পরীক্ষা থেকে তা প্রমাণ হয় না।
একই দিনে বিএসটিআই জানায়, লাইসেন্সধারী ১৪টা ব্র্যান্ডের দুধ পরীক্ষা করে তারা ক্ষতিকর কিছু পায় নাই।
২৯ জুন মিল্ক ভিটার ব্যবস্থাপনা পরিচালক গবেষণাকে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যমূলক আখ্যা দিয়ে মামলা করার কথা জানান। একই দিনে ফার্মেসি বিভাগের চেয়ারম্যান সীতেশ চন্দ্র বাছার প্রতিবাদলিপি দিয়ে জানান, এটা বিভাগের গবেষণা না।
১০ জুলাই খামারবাড়িতে দুগ্ধশিল্প নিয়ে সেমিনারে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব কাজী ওয়াছি উদ্দিন বলেন, গবেষণা পিয়ার-রিভিউড জার্নালে ছাপা হয়ে থাকলে সাত দিনের মধ্যে মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে হবে, নইলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
১৩ জুলাই ফারুকের দল দ্বিতীয় দফায় পরীক্ষা করে, এবারও দশটা নমুনার সবগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক পায়।
১৪ জুলাই হাইকোর্টে বিএসটিআইয়ের আইনজীবী স্বীকার করেন, দুধে অ্যান্টিবায়োটিক বা ডিটারজেন্ট আছে কিনা, তা পরীক্ষার ব্যবস্থা বিএসটিআইয়ের নাই। বিএসটিআই দুধে ৯টা বিষয় পরীক্ষা করেছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দল ১৯টা।
২৫ জুন বিএসটিআই যে “ক্ষতিকর কিছু পায় নাই” বলেছিল, সেই পরীক্ষায় অ্যান্টিবায়োটিক খোঁজা হয় নাই।
আদালত সেদিন ১৪টা ব্র্যান্ডের দুধ চারটা ল্যাবে পরীক্ষার নির্দেশ দেয়, এবং বিএসটিআইকে অ্যান্টিবায়োটিক ও ডিটারজেন্ট পরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরির পরিকল্পনা জমা দিতে বলে।
১৬ জুলাই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ নিজেদের করানো পরীক্ষার ফল আদালতে দেয়। ১৪টা ব্র্যান্ডের ১১টার দুধে সীসা পাওয়া যায়, কেজিতে সর্বোচ্চ ০.১ মিলিগ্রাম, যেখানে সীমা ০.০২। অ্যান্টিবায়োটিক এই দফাতেও খোঁজা হয় নাই।
২৮ জুলাই আদালতের নির্দেশে করা চার ল্যাবের পরীক্ষায় ১৪টা ব্র্যান্ডের সবগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক এবং ১০টায় সীসা পাওয়া যায়। সেদিন হাইকোর্ট পাঁচ সপ্তাহের জন্য ১৪ কোম্পানির পাস্তুরিত দুধ তৈরি ও বিক্রি বন্ধ করে দেয়।
নিষেধাজ্ঞা টিকে তিন দিন, কারণ ২৯ থেকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আপিল বিভাগের চেম্বার জজ মো. নূরুজ্জামান তিন দফায় সব কোম্পানির নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করেন। অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম আদালতে বলেন, যা পাওয়া গেছে তা বিপজ্জনক মাত্রা ছাড়ায় নাই।
৩০ জুলাই শেখ হাসিনা লন্ডন থেকে টেলিকনফারেন্সে প্রশ্ন তোলেন, অধ্যাপক আমদানি করা পাউডার দুধ পরীক্ষা করেছেন কিনা, এবং আমদানিকারকদের কারসাজি খতিয়ে দেখতে বলেন।
৩১ জুলাই কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ভারতের এসজিএস ল্যাবে করানো পরীক্ষার কাগজ দেখিয়ে বলেন, দুধে ক্ষতিকর কিছু নাই।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে হেলিয়ন জার্নালে ছাপা গবেষণায় ঢাকার ২৭টা দুধের নমুনার সবগুলোতে অক্সিটেট্রাসাইক্লিন পাওয়া যায়, ৩৭ শতাংশে মাত্রা ছিল সীমার বেশি।
দুধে অ্যান্টিবায়োটিক পাওয়ার পর রাষ্ট্রের দপ্তরগুলো গবেষকের কাছে নাম ও পদ্ধতি চেয়েছে, কিন্তু দুধে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়মিত পরীক্ষার কোনো সরকারি ব্যবস্থা পরের ছয় বছরে চালু হওয়ার খবর নাই।
➖
টাঙ্গাইলের মির্জাপুরে ২০১৭ সালে দশটা মুরগির খামারে করা গবেষণায় দেখা যায়, ছোট খামারির বাচ্চা ও খাবার আসে ডিলারের কাছ থেকে বাকিতে। মুরগি বড় হলে সেই ডিলার কিনে নেন, এবং কোন ওষুধ কবে দিতে হবে, সেটাও তিনি বলে দেন।
ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের মাসে সাত থেকে দশ হাজার ডলার, তখনকার হিসাবে প্রায় সাড়ে পাঁচ থেকে আট লাখ টাকার বিক্রির লক্ষ্য থাকত।
দশটা খামারের পাঁচটায় তখন কলিস্টিন দেওয়া হচ্ছিল। কলিস্টিন ডাক্তাররা দেন অন্য কোনো অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করলে। ২০২২ সালে পশুপাখির জন্য এটা পুরাপুরি নিষিদ্ধ হয়, কিন্তু নিষেধাজ্ঞার পরেও খামারে এর ব্যবহার চলার কথা পরের গবেষণায় উঠে আসে।
গাজীপুর ও চট্টগ্রামের ৩৬টা খামারে ২০২২-২৩ সালে করা গবেষণা ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্লস ওয়ান জার্নালে ছাপা হয়। ওই খামারগুলোতে ব্যবহার হওয়া অ্যান্টিবায়োটিকের ৬৫ থেকে ৯০ শতাংশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে মানুষের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ।
গবেষকরা লেখেন, পশুর চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে দিতে হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম দেশে নাই।
২০২৫ সালের আগস্টে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক সেমিনারে সাত জেলার ১০০ খামারের গবেষণার ফল জানানো হয়। তাতে দেখা যায়, ৬৮ শতাংশ খামারি পশুচিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক কেনেন।
অর্ধেক খামারি মুরগি তাড়াতাড়ি বড় করতে ওষুধ দেন, এবং মাংসে ওষুধ যাতে থেকে না যায় সেজন্য বিক্রির আগে কয়েক দিন ওষুধ বন্ধ রাখার যে নিয়ম, সেটা মানেন না।
২০২৬ সালের এপ্রিলে এনপিজে সায়েন্স অব ফুড জার্নালে বাংলাদেশের খামার ও বাজারের মুরগির মাংসে অ্যান্টিবায়োটিক কতটা থেকে যায়, তা নিয়ে গবেষণা ছাপা হয়।
গবেষণা করেছে যুক্তরাজ্যের রয়্যাল ভেটেরিনারি কলেজ, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি অ্যান্ড অ্যানিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট, যুক্তরাজ্য সরকারের গবেষণা তহবিলের টাকায়।
বাংলাদেশের ৯৯টা খামার ও ৫০টা বাজার থেকে নেওয়া ২৭৩টা মুরগির বুকের মাংস ইউরোপীয় ইউনিয়নের রেফারেন্স ল্যাবের পদ্ধতিতে ৬৯ রকম অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য পরীক্ষা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়ন প্রতিটা ওষুধের জন্য মাংসে সর্বোচ্চ কতটুকু থাকা চলবে, সেই সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে।
৪০টা নমুনায়, অর্থাৎ প্রতি সাতটার একটায়, অন্তত একটা অ্যান্টিবায়োটিক সেই সীমা ছাড়িয়েছে, নয়টায় মাত্রা ছিল সীমার দশ গুণের বেশি।
একই ওষুধের তালিকা ধরে ইউরোপের ছয় দেশ ১৬,৮৭৭টা নমুনা পরীক্ষা করে সীমা ছাড়ানো পেয়েছিল ১৫টা। বাংলাদেশে প্রতি সাতটায় একটা, ইউরোপে প্রতি হাজারে একটারও কম।
গবেষকদের মতে আসল সংখ্যা আরও বেশি, কারণ বাংলাদেশের ১৩টা খামার লেভোফ্লক্সাসিন দেওয়ার কথা জানালেও ইউরোপের তালিকায় এই ওষুধ না থাকায় এটা খোঁজা হয় নাই। বাজারের কয়েকটা নমুনায় ওষুধের মাত্রা এত বেশি ছিল যে গবেষকরা সন্দেহ করেন, অসুস্থ মুরগির রোগ লুকাতে বিক্রির ঠিক আগে ওষুধ দেওয়া হয়।
সরকারের নিজের পরীক্ষা বলতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের এককালীন গবেষণা, ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুনে করা।
২০২৩ সালের ১২ জানুয়ারি কৃষিমন্ত্রী জানান, ৩১৫টা নমুনার সবগুলো সীমার নিচে। এই গবেষণার পদ্ধতি, ওষুধের তালিকা ও বিস্তারিত ফল প্রকাশিত আকারে খুঁজে পাওয়া যায় নাই।
মুরগিকে কী ওষুধ দেওয়া হবে, তা ঠিক করেন ডিলার ও খামারি, এবং মাংসে কী থেকে যায়, তার হিসাব আসে বিদেশি অনুদানের গবেষণা থেকে, সরকারি রুটিন পরীক্ষা থেকে না।
➖
মুরগির মাংসে ওষুধ থেকে যাওয়ার চেয়ে বড় বিপদ হলো এমন ব্যাকটেরিয়া তৈরি হওয়া, যেটা ওষুধে আর মরে না। এই ক্ষমতা ব্যাকটেরিয়ার জিনে থাকে, সেই জিন এক ব্যাকটেরিয়া থেকে আরেক ব্যাকটেরিয়ায় ছড়াতে পারে।
কলিস্টিনের বিরুদ্ধে টিকে থাকার জিনের নাম এমসিআর-১।
২০১৮ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরে চট্টগ্রামের ২০টা ব্রয়লার খামার থেকে নেওয়া ১,২০০টা ই. কোলাই ব্যাকটেরিয়ার প্রতি চারটার একটায় এমসিআর-১ পাওয়া যায়।
ঢাকার ৪০টা কাঁচাবাজার ও ৮টা সুপারশপের ব্রয়লার মাংসের ১৩৬টা নমুনার ৭৮ শতাংশে কলিস্টিন-প্রতিরোধী ই. কোলাই পাওয়া যায়, এবং সবগুলোতে এমসিআর-১ ছিল, এই গবেষণা ছাপা হয় ২০২৩ সালে।
২০২০ সালে উত্তরা আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়রিয়া নিয়ে আসা রোগীদের ২২৫টা নমুনার ১৫.৫৬ শতাংশে এমসিআর জিন পাওয়া যায়, এবং রোগীদের অর্ধেকের বয়স ছিল এক বছর দুই মাসের কম।
এই শিশুদের শরীরের এমসিআর জিন মুরগি থেকে এসেছে, এমন সরাসরি প্রমাণ এই গবেষণাগুলোতে নাই। এগুলো দেখায়, নিষিদ্ধ ওষুধের বিরুদ্ধে টিকে থাকা জিন খামারে আছে, বাজারের মাংসে আছে, এবং এক বছরের শিশুর পেটেও আছে।
২০২১ সালে বাংলাদেশে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ না করা সংক্রমণে সরাসরি ২৩,৪৫৪ জন মারা যান।
এই প্রতিরোধের কতটা খামার থেকে আসছে, তা বলা যায় না, কারণ দেশে পশুপাখির জন্য বছরে কত অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি হয়, সেই সরকারি হিসাবও পাওয়া যায় না।
➖
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০২৬ সালের ৪ জুন দূষিত খাবারে অসুখ ও মৃত্যুর নতুন বৈশ্বিক হিসাব প্রকাশ করে। ২০২১ সালে বিশ্বে ৮৬ কোটি ৬০ লাখ মানুষ দূষিত খাবারে অসুস্থ হয়েছেন এবং ১৫ লাখ মারা গেছেন, অসুস্থতার প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকায়।
অসুস্থতার প্রায় পুরাটা জীবাণুতে, কিন্তু মৃত্যুর ৭৩ শতাংশ রাসায়নিকে, এবং রাসায়নিকে যত মৃত্যু তার ৪২ শতাংশ অজৈব আর্সেনিকে, ৩১ শতাংশ সীসায়। অর্থাৎ দূষিত খাবারে যত মানুষ মারা যায়, তার অর্ধেকের বেশি মারা যায় এই দুই ধাতুতে।
বাংলাদেশে মানুষ দিনে গড়ে ৩২৯ গ্রাম চাল খান, ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপ অনুযায়ী। আর্সেনিক মাটি ও সেচের পানি থেকে ধানে ওঠে, এবং বহু বছর ধরে অল্প অল্প করে শরীরে গেলে চামড়ার রোগ ও ক্যান্সার হয়।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাইস অ্যানালিটিক্যাল ল্যাবের এক পাইলট পরীক্ষার ফল প্রকাশ হয়।
আট বিভাগের ১৭টা বাজার থেকে নেওয়া ১০৪টা চালের নমুনার ১৯টায়, মানে প্রায় প্রতি পাঁচটায় একটায়, অজৈব আর্সেনিক পাওয়া যায় জাতিসংঘের খাদ্য-মান সংস্থা কোডেক্সের সীমা, কেজিতে ০.২ মিলিগ্রামের বেশি। ক্যাডমিয়াম, সীসা এবং ২২ রকম কীটনাশক সব নমুনায় সীমার নিচে ছিল।
ল্যাবের মান-ব্যবস্থাপক হাবিবুল বারী সজীব বলেন, আতঙ্কের কারণ নাই, দরকার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং বড় পরিসরে গবেষণা। গবেষক দল নিজেই বলেছে, এটা পাইলট পরীক্ষা, এর ভিত্তিতে দেশের সব বাজার, জাত, এলাকা বা মৌসুমের চাল নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত টানা যায় না।
ঠিক জিনিস পরীক্ষা করা হলে রাষ্ট্র কত দ্রুত ফল আনতে পারে, হলুদের ঘটনা তার প্রমাণ।
স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা গ্রামের নারীদের রক্তে সীসা পাচ্ছিলেন, কিন্তু কোথা থেকে আসছে বুঝতে পারছিলেন না।
সম্ভাব্য উৎস, টিনের ক্যানের ঝালাই, গর্ভাবস্থায় খাওয়া মাটি ও হলুদের সীসার আইসোটোপ রক্তের সীসার সঙ্গে মিলিয়ে তারা দেখেন, মিলে কেবল হলুদ। ফল ছাপা হয় ২০১৯ সালে।
হলুদ পালিশ করার কারখানাগুলো রং উজ্জ্বল করতে লেড ক্রোমেট মেশাত। এটা শিল্পকারখানার হলুদ রঞ্জক, খেলনা ও আসবাব রং করতে ব্যবহার হয়।
আইসিডিডিআর,বির গবেষকরা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে এক্স-রে ফ্লুরোসেন্স অ্যানালাইজার চালানো শেখান, হাতে ধরা এই মেশিনে বাজারে দাঁড়িয়েই হলুদে সীসা ধরা যায়। কর্তৃপক্ষ পাইকারি বাজারে লিফলেট বিলি করে জানায়, হলুদে লেড ক্রোমেট মেশানো স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, এবং এখন থেকে বাজারে পরীক্ষা করে ধরা হবে।
২০১৯ সালের অক্টোবরে কর্তৃপক্ষের ভ্রাম্যমাণ আদালত দুই পাইকারকে জরিমানা করে ৯০০ কেজি হলুদ জব্দ করে।
২০১৯ সালে বাজারের হলুদের ৪৭ শতাংশ নমুনায় সীসা পাওয়া যেত, ২০২১ সালের শুরুতে একটাতেও পাওয়া যায় নাই। ২০১৭ সালে ৩০ শতাংশ হলুদের কারখানায় রঞ্জক ব্যবহারের প্রমাণ ছিল, ২০২১ সালে কোনোটায় না, এবং কারখানার শ্রমিকদের রক্তে সীসা ৩০ শতাংশ কমে।
কিন্তু একই গবেষকরা ২০২৩ সালে লেখেন, কর্তৃপক্ষ এককালীন অভিযানে সঙ্গ দিতে পেরেছে, নিয়মিত নজরদারি চালু রাখতে পারে নাই। ২০২৫ সালের শিশু জরিপে দেশের ৩৮ শতাংশ শিশুর রক্তে ঝুঁকির সীমার বেশি সীসা পাওয়া যায়।
২০২৬ সালের ১৭ আগস্ট মন্ত্রিসভা সীসামুক্ত বাংলাদেশের দশ বছরের একটা পরিকল্পনা পাস করে, তাতে ভেজাল হলুদ ও মসলাকে সীসার উৎস হিসেবে ধরা হয়েছে, কিন্তু নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ কী পরীক্ষা করবে, সেই কথা পরিকল্পনার খবরে নাই।
দূষিত খাবারে বিশ্বে সবচেয়ে বেশি মানুষ মারা যায় যে দুই বিষে, সেই আর্সেনিক ও সীসা বাংলাদেশে মাপা হয়েছে পাইলটে ও প্রকল্পে, এবং হলুদের মতো সফল প্রকল্প শেষ হওয়ার পরেও নিয়মিত পরীক্ষা চালু থাকে নাই।
➖
রাষ্ট্র মাপতে পারে না, ব্যাপারটা এমন না, কারণ ইউরোপ শর্ত দেওয়ার পর চিংড়িতে মাপা শুরু হয়েছিল।
২০০৯ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের চিংড়িতে নিষিদ্ধ অ্যান্টিবায়োটিক নাইট্রোফুরান পেয়ে ৪৮টা চালান ফেরত পাঠায়। এরপর সরকার আইন বদলায়, ল্যাব বাড়ায় এবং পরীক্ষার নিয়ম কড়া করে।
মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ দপ্তর তখন থেকে জাতীয় পরিকল্পনার অধীনে চিংড়ি ও মাছের খামার এলাকা থেকে নমুনা নেয় এবং ক্লোরামফেনিকল, নাইট্রোফুরান, টেট্রাসাইক্লিন, সালফোনামাইডসহ বিভিন্ন ওষুধ খোঁজে।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় দপ্তরের তিন ল্যাবে মাসে প্রায় ১,৫০০ পরীক্ষার ব্যবস্থা তৈরি হয়েছিল ইউরোপের টাকায়, ২০০৫ থেকে ২০১০ সালের প্রকল্পে, এবং ২০১৫ সালে ইউরোপের নিরীক্ষা জানায়, বাংলাদেশের চিংড়ি তাদের শর্ত পূরণ করছে।
এই পরীক্ষার ফল যায় ইউরোপে, দেশের মানুষ দেখে না। অথচ চিংড়িতে যে টেট্রাসাইক্লিন ও সালফোনামাইড নিয়ম করে খোঁজা হয়, বাংলাদেশ, ভারত ও ভিয়েতনামের মুরগি নিয়ে ওই গবেষণায় সীমা ছাড়ানো ফলের বড় অংশ এসেছে এই দুই গোত্রের ওষুধ থেকে।
কীটনাশকের বেলায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২০২৬ সালের ২৮ জানুয়ারি নিয়ম জারি করে, বাংলাদেশের শিম তাদের বন্দরে ঢোকার আগে কীটনাশকের জন্য বাড়তি পরীক্ষা হবে।
দেশের বাজারের সবজিতে কীটনাশক কতটা, তা জানা যায় গবেষণা থেকে। ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে টক্সিকোলজি রিপোর্টস জার্নালে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের ১০৭টা গবেষণার ১,৫৭৭টা সবজির নমুনা একসঙ্গে মেলানো হয়।
প্রতি দশটা নমুনার তিনটায় কীটনাশক পাওয়া গেছে, এবং যেগুলোতে পাওয়া গেছে তার প্রায় তিন-চতুর্থাংশে মাত্রা সীমার বেশি।
শসার অর্ধেকের বেশি নমুনায় কীটনাশক ছিল, টমেটোর ৪১ শতাংশে। শিমের যেসব নমুনায় কীটনাশক পাওয়া গেছে, তার ৯২ শতাংশ সীমা ছাড়িয়েছে।
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে করা গবেষণায় ৩২০টা ফলের নমুনার ৩০টায় কীটনাশক সীমা ছাড়ায়, লিচুতে সবচেয়ে বেশি।
একই গবেষণায় লালশাকে ক্যাডমিয়াম পাওয়া যায় কেজিতে ৭০৪ মাইক্রোগ্রাম, যেখানে সীমা ১৯০। এটাও ছিল একটা গবেষণা প্রকল্প, বছর বছর চলা নজরদারি না।
রপ্তানির চিংড়ি ও শিমে যা নিয়ম করে খোঁজা হয়, দেশের মুরগি ও সবজিতে তা খোঁজা হয় গবেষকের প্রকল্পে।
➖
দেশের মানুষের খাবার দেখার দায়িত্ব বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের, ২০১৩ সালের আইনে তৈরি, কাজ শুরু ২০১৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে।
জাপানের উন্নয়ন সংস্থা জাইকা ২০২৪ সালে কর্তৃপক্ষের অবস্থা জরিপ করে দেখে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে সদর দপ্তরে কর্মী ১০৪ জন, মাঠে ১৪৪ জন, ৬৪ জেলার প্রতিটায় একজন নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা, একজন নমুনা-সহকারী ও একজন অফিস সহকারী।
কর্তৃপক্ষের নিজের কোনো স্বীকৃত ল্যাব নাই, আছে একটা ছোট পরীক্ষাগার, নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা করাতে হয় অন্যের ল্যাবে।
২০২৪ সালের ৩০ ডিসেম্বর কর্তৃপক্ষের তখনকার চেয়ারম্যান জাকারিয়া সাংবাদিকদের জানান, নিয়ম অনুযায়ী প্রতিটা জেলা থেকে মাসে কমপক্ষে দুইটা খাদ্য নমুনা কর্তৃপক্ষের ল্যাবে পাঠাতে হয়।
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় রেফারেন্স ল্যাব বানানোর ২,৪০৯ কোটি টাকার প্রকল্প ২০২৫ সালের শুরুতে একনেকে পাস হয়েছে, শেষ হওয়ার কথা ২০৩৪ সালের ডিসেম্বরে।
কাজ যে কম হয় তা না। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কর্তৃপক্ষ প্রায় ১৬,০০০ পরিদর্শন করেছে, ১৫০ প্রতিষ্ঠানকে দণ্ড দিয়েছে, ১ কোটি ৪ লাখ টাকা জরিমানা করেছে এবং ল্যাবে ১,৭১৩টা নমুনা পরীক্ষা করেছে।
অভিযানের খবরে জরিমানা হয় লেবেল না থাকায়, খোলা খাবারে মাছি বসায়, মেয়াদ পার হওয়া ইস্টে, পাঙাসকে ডোরি নামে বেচায়, অর্থাৎ চোখে দেখা যায় এমন অপরাধে।
কিন্তু কোন খাবারের নমুনায় কোন রাসায়নিক কত মাত্রায় মিলল, তার কোনো বার্ষিক প্রতিবেদন কর্তৃপক্ষ ছাপে না, বিএসটিআই, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরও ছাপে না।
জাইকার জরিপের ভাষায়, দেশে কোন অসুখ কোন খাবার থেকে হচ্ছে, সেই তথ্য নাই।
পশু ও মাছের ওষুধ এবং কীটনাশকের সীমা নিয়ে বিধিমালার খসড়া ২০২৪ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে জানানো হয়। ২০২৫ সালের জুনেও মার্কিন কৃষি বিভাগ লেখে, খসড়াগুলো তখনো সংশোধন হচ্ছে, এবং সীমা ছাড়ানো খাবার ধরার জন্য বন্দরে কোনো পরীক্ষা বা শাস্তির নিয়ম নাই।
২০১৪ সালে গাবতলীতে ১০০ টন আম নষ্ট হয়েছিল বাতাস মাপার মিটারের রিডিং দেখে। ২০২৬ সালে সরকারি ল্যাবে বাজারের চালে আর্সেনিকের যে পরীক্ষা হলো, সেটাও পাইলট।
খাবার নিরাপদ কিনা, তা জানার ন্যূনতম শর্ত একটা। প্রতি বছর কোন খাবারের কত নমুনা, কোন ল্যাবে, কোন রাসায়নিকের জন্য পরীক্ষা হলো এবং কত শতাংশ সীমা ছাড়াল, সেই হিসাব দেশের মানুষের সামনে রাখা।
সূত্র: Broadsheet
