
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস বা একধরনের দীর্ঘস্থায়ী বাতের সমস্যা শুরুতে সব সময় তীব্র ব্যথা দিয়ে প্রকাশ পায় না। কখনো কখনো জোড়ে হালকা ব্যথা, সকালে আড়ষ্টতা কিংবা ফোলাভাবের মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ বারবার দেখা দিলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
ভারতের চিকিৎসা গবেষণা পরিষদ (আইসিএমআর) এবং হায়দরাবাদের জাতীয় পুষ্টি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (এনআইএন) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এক গবেষণায় রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসে কম বৈচিত্র্য ও পুষ্টির ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, সুস্থ ব্যক্তিদের তুলনায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যতালিকায় প্রদাহ বাড়ানোর প্রবণতা বেশি।
‘ডেকান ক্রনিকল’-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৮ থেকে ৫৫ বছর বয়সী ৬১৫ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে গবেষণাটি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৩০১ জন নতুন করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং ৩১৪ জন ছিলেন সুস্থ ব্যক্তি।
গবেষণায় খাবারের প্রদাহ সৃষ্টির প্রবণতা পরিমাপ করতে ‘ডায়েটারি ইনফ্ল্যামেটরি ইনডেক্স’ ব্যবহার করা হয়। এতে আক্রান্ত ব্যক্তিদের গড় স্কোর ছিল ২ দশমিক ১৮। অন্যদিকে সুস্থ ব্যক্তিদের স্কোর ছিল শূন্য দশমিক ৩৭।
গবেষকদের পর্যবেক্ষণে, আক্রান্ত ব্যক্তিদের খাদ্যাভ্যাসে বৈচিত্র্য তুলনামূলকভাবে কম ছিল এবং বিভিন্ন অণুপুষ্টির পর্যাপ্ততা নিয়েও ঘাটতি দেখা গেছে। তবে এসব ফলাফল থেকে সরাসরি বলা যায় না যে প্রদাহ বাড়াতে পারে এমন খাবারই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের কারণ। খাদ্যাভ্যাস ও রোগের সম্পর্ক বুঝতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস কী?
মেয়ো ক্লিনিকের তথ্য অনুযায়ী, রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহজনিত স্বয়ংপ্রতিরোধী রোগ। এ রোগে শরীরের রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা ভুলবশত জোড়ের ভেতরের আবরণে আক্রমণ করে। ফলে জোড়ে ব্যথা, ফোলাভাব ও আড়ষ্টতা দেখা দেয়। দীর্ঘদিন রোগটি নিয়ন্ত্রণে না থাকলে জোড়ের ক্ষতি হতে পারে।
এ রোগ শুধু জোড়েই সীমাবদ্ধ থাকে না; শরীরের অন্যান্য অঙ্গেও প্রভাব ফেলতে পারে। তাই প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্ত করে চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ।
যে লক্ষণগুলো অবহেলা করা ঠিক নয়
নয়াদিল্লির মণিপাল হাসপাতালের অস্থি ও জোড়বিষয়ক ইনস্টিটিউটের চেয়ারম্যান চিকিৎসক রাজীব ভার্মা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের প্রাথমিক লক্ষণগুলো শনাক্ত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। লক্ষণগুলো হলো—
১. সকালে জোড়ে আড়ষ্টতা
ঘুম থেকে ওঠার পর হাতের আঙুলসহ বিভিন্ন জোড় শক্ত বা আটকে আছে বলে মনে হতে পারে। আড়ষ্টতা ৩০ মিনিট থেকে এক ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় স্থায়ী হতে পারে। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী সকালের আড়ষ্টতা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
২. জোড়ে দীর্ঘস্থায়ী ব্যথা
হাতের আঙুল, কবজি কিংবা পায়ের জোড়ে ব্যথা হতে পারে। শুরুতে ব্যথা কম থাকলেও ধীরে ধীরে তা বাড়তে পারে। ব্যথার সঙ্গে আড়ষ্টতা বা ফোলাভাব থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
৩. জোড়ের চারপাশে ফোলাভাব
প্রদাহের কারণে জোড়ের চারপাশ ফুলে যেতে পারে। আক্রান্ত স্থান স্পর্শ করলে উষ্ণও মনে হতে পারে। বিশেষ করে একাধিক জোড়ে এমন লক্ষণ দেখা দিলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
৪. নড়াচড়ার ক্ষমতা কমে যাওয়া
জোড় শক্ত হয়ে যাওয়ায় হাত ওপরে তোলা, মুঠো করা, হাঁটু ভাঁজ করা কিংবা স্বাভাবিকভাবে হাঁটাচলা করতে অসুবিধা হতে পারে। দৈনন্দিন কাজে এমন সমস্যা দীর্ঘস্থায়ী হলে চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
৫. নড়াচড়ার সময় ঘর্ষণ বা শব্দ
জোড় নাড়ানোর সময় খসখসে অনুভূতি বা শব্দ হতে পারে। তবে শুধু জোড়ে শব্দ হলেই রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিস হয়েছে, এমন নয়। ব্যথা, ফোলাভাব ও নড়াচড়ার সীমাবদ্ধতার সঙ্গে এ ধরনের সমস্যা দেখা দিলে চিকিৎসকের মূল্যায়ন প্রয়োজন।
খাদ্যাভ্যাসে কীভাবে নজর দেবেন?
সুষম ও বৈচিত্র্যময় খাদ্যাভ্যাস শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ফলমূল, ডাল, পূর্ণশস্য, বাদাম এবং উপযুক্ত প্রোটিনের উৎস রাখা যেতে পারে। অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার ও অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ সীমিত রাখাও উপকারী।
তবে শুধু খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করে রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসা সম্ভব নয়। রোগটি শনাক্ত হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে সকালে দীর্ঘস্থায়ী আড়ষ্টতা, একাধিক জোড়ে ব্যথা বা ফোলাভাব দেখা দিলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া উচিত।
গবেষণাটি খাদ্যাভ্যাস ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের মধ্যকার সম্পর্কের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। তবে খাবারের প্রদাহজনিত সূচক বেশি হলেই কারও এ রোগ হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। রোগের প্রকৃত কারণ ও খাদ্যাভ্যাসের ভূমিকা বুঝতে আরও বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রয়োজন।
