খাদ্য পেলেও মিলছে না পুষ্টি, দেশে প্রতি ৪ শিশুর একজন খর্বকায়

বাংলাদেশে অপুষ্টি এখন আর কেবল খাদ্যঘাটতির তালিকায় সীমাবদ্ধ নেই; এটি রূপ নিয়েছে বড় ধরনের জনস্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সংকটে। বর্তমানে দেশে পাঁচ বছরের কম বয়সী প্রতি চারটি শিশুর একটি খর্বকায় (বয়সের তুলনায় উচ্চতা কম)। পাশাপাশি ১৩ শতাংশ শিশু কৃশকায় এবং ৫৩ শতাংশ গর্ভবতী নারী রক্তস্বল্পতায় ভুগছেন।

অন্যদিকে, প্রজননক্ষম বয়সী ৫৬ শতাংশ নারী অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতায় আক্রান্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপুষ্টির এই ‘ত্রিমুখী সংকট’-এর কারণে দেশে প্রতিবছর জাতীয় অর্থনীতির (জিডিপি) ৮ শতাংশের বেশি ক্ষতি হচ্ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু খাদ্য নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; মাতৃপুষ্টি, নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন, প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি। তা না হলে খর্বতা ও অপুষ্টির এই চক্র থেকে বের হওয়া কঠিন হবে।

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীতে ‘প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় পুষ্টি কার্যক্রম সংযুক্তিকরণ ও সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব’ শীর্ষক এক গোলটেবিল বৈঠকে এসব তথ্য ও মতামত তুলে ধরা হয়। যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে ম্যাক্স ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ।

অনুষ্ঠানে ব্র্যাকের ক্লাইমেট ব্রিজ ফান্ডের প্রধান সায়কা সিরাজ বলেন, ‘দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের খাদ্য এখনো শর্করা বা চালনির্ভর। বিশেষ করে চর, হাওর, বস্তিসহ প্রান্তিক এলাকায় পুষ্টিসেবা এখনো দুর্বল। পাশাপাশি বাল্যবিয়ে, পোশাকশ্রমিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রবীণদের পুষ্টির বিষয়টি পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।’

আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশের (আইসিডিডিআর,বি) নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, ‘শিশুর খর্বতা শুধু খাদ্যের অভাবের ফল নয়। গর্ভকালীন অপুষ্টি, বিশুদ্ধ পানির অভাব, দুর্বল স্যানিটেশন ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের এতে বড় ভূমিকা রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে খর্বতার সূচনা হয় শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগেই। ’ তিনি বলেন, ‘দেশে বর্তমানে প্রায় চার লাখ শিশু তীব্র অপুষ্টিতে ভুগছে, যাদের অধিকাংশকেই কমিউনিটিভিত্তিক সেবার মাধ্যমে সুস্থ করে তোলা সম্ভব। স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৩ থেকে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করা সম্ভব হলে খর্বতার হার ২৪ শতাংশ থেকে কমিয়ে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে তিনি মত দেন।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, ‘দেশের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষ এখনো প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য বেসরকারি খাতের ওপর নির্ভর করে। অপুষ্টির কারণে দেশে উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ ও কিডনি রোগের মতো অসংক্রামক ব্যাধি আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বর্তমানে দেশে মোট রোগব্যাধির প্রায় ৭০ শতাংশই অসংক্রামক।’

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, ‘সরকার দেশের প্রতিটি ইউনিয়ন ও শহরের ওয়ার্ডে ‘প্রাইমারি হেলথ কেয়ার ইউনিট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর আওতায় মাঠপর্যায়ে বর্তমানে কর্মরত ৪৩ হাজার স্বাস্থ্যকর্মীর পাশাপাশি আরও এক লাখ নতুন স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে।’ এ ছাড়া প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড প্রদান এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

সূত্র: কালের কণ্ঠ

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ