
‘মাছে-ভাতে বাঙালি’, প্রবাদটির মতোই বাঙালির খাদ্যতালিকায় ভাতের রয়েছে অবিচ্ছেদ্য অবস্থান। প্রতিদিনের তিন বেলার খাবারের সঙ্গে ভাত যেন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। কিন্তু ওজন কমানো কিংবা পেটের অতিরিক্ত চর্বি বা ভুঁড়ি কমানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অনেকেই ভাত একেবারেই বাদ দিয়ে দেন।
তবে চিকিৎসাবিজ্ঞান ও পুষ্টিবিদদের মতে, ভুঁড়ি বাড়ার জন্য শুধু ভাতকে দায়ী করা ঠিক নয়। বরং অতিরিক্ত পরিমাণে ভাত খাওয়া, ভুল খাদ্যাভ্যাস এবং শারীরিক পরিশ্রমের ঘাটতিই ওজন ও পেটের মেদ বাড়ার বড় কারণ। তাই সঠিক কৌশল মেনে পরিমিত ভাত খেয়েও শরীর সুস্থ ও ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘হেলথ’ ও ‘হার্ভার্ড হেলথ পাবলিশিং’-এর পুষ্টিবিষয়ক তথ্যেও ভাতকে শরীরের শক্তির অন্যতম উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভাত মূলত সহজপাচ্য কার্বোহাইড্রেট, যা শরীরে প্রয়োজনীয় শক্তি জোগাতে পারে।
ভুঁড়ি বাড়ে কেন?
যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া ইউনিভার্সিটি মেডিকেল সেন্টারের নিবন্ধিত পুষ্টিবিজ্ঞানী জিলিয়ান কুবাল্লার মতে, সাদা ভাতে প্রাকৃতিকভাবে ফ্যাট থাকে না এবং এতে ট্রান্স ফ্যাট বা কোলেস্টেরলও নেই।
তবে সাদা ভাত পরিশোধিত কার্বোহাইড্রেট হওয়ায় এর গ্লাইসেমিক ইনডেক্স তুলনামূলক বেশি। ফলে একসঙ্গে অতিরিক্ত পরিমাণে ভাত খেলে রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বাড়লে শরীর থেকে ইনসুলিন নিঃসরণও বাড়ে। ইনসুলিন রক্তের অতিরিক্ত গ্লুকোজকে বিভিন্ন কোষে ব্যবহারের জন্য পাঠানোর পাশাপাশি অতিরিক্ত শক্তি চর্বি হিসেবে সঞ্চয়ে ভূমিকা রাখে। ফলে নিয়মিত প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ক্যালরি গ্রহণ করলে শরীরে, বিশেষ করে পেটের চারপাশে চর্বি জমতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু ভাত নয়, প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণই ওজন ও ভুঁড়ি বাড়ার অন্যতম মূল কারণ।
ভাত খেয়েও ভুঁড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখার ৫ উপায়
১. ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করুন
ভুঁড়ি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ভাতের পরিমাণ ঠিক রাখা। দুপুরের খাবারে রান্না করা ভাত সর্বোচ্চ এক কাপ বা প্রায় ১৫০ গ্রাম রাখা যেতে পারে। প্লেটের প্রায় এক-চতুর্থাংশ ভাত এবং বাকি অংশ শাকসবজি ও চর্বিহীন প্রোটিন দিয়ে সাজানো ভালো।
২. ভাতের সঙ্গে রাখুন প্রোটিন ও আঁশ
শুধু ভাত কিংবা ভাতের সঙ্গে আলু-ভর্তা খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। ভাতের সঙ্গে পর্যাপ্ত আঁশযুক্ত শাকসবজি, ডাল এবং প্রোটিনের উৎস হিসেবে ডিম বা মাছ রাখা যেতে পারে।
প্রোটিন ও আঁশযুক্ত খাবার হজমের প্রক্রিয়াকে ধীর করতে সহায়তা করে। এতে দীর্ঘ সময় পেট ভরা থাকার অনুভূতি তৈরি হয় এবং রক্তে শর্করার দ্রুত ওঠানামাও নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়।
৩. চাইলে লাল চাল বা বাসমতি চাল বেছে নিন
সাধারণ ছাঁটা সাদা চালের পরিবর্তে লাল চাল কিংবা তুলনামূলক কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সের বাসমতি চালের ভাত বেছে নেওয়া যেতে পারে।
লাল চালে প্রাকৃতিক আঁশ ও ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স থাকে। আঁশ দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা রাখতে সহায়তা করে এবং সুষম খাদ্যাভ্যাসের অংশ হিসেবে এটি উপকারী হতে পারে।
৪. রান্নার সময় মাড় ঝরিয়ে নিতে পারেন
ভাত রান্নার পর অতিরিক্ত মাড় বা ফ্যান ঝরিয়ে নেওয়া একটি প্রচলিত কৌশল। এতে ভাতের কিছু অতিরিক্ত স্টার্চ ও ক্যালরি কমতে পারে, যা মোট ক্যালরি গ্রহণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে সহায়তা করতে পারে।
৫. রাতে পরিমিত ভাত, এরপর হাঁটা
ঘুমানোর ঠিক আগে ভারী খাবার খাওয়ার অভ্যাস এড়িয়ে চলা ভালো। রাতে ভাত খেলে ঘুমানোর অন্তত তিন ঘণ্টা আগে পরিমিত পরিমাণে খাওয়া যেতে পারে।
খাওয়ার পর ১০ থেকে ২০ মিনিট হাঁটাও উপকারী। পাশাপাশি প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কসরত বা দ্রুত হাঁটার অভ্যাস ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে।
ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই
ভাত কোনো বিষাক্ত বা নিষিদ্ধ খাবার নয়। এটি শরীরের শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ভাত খাওয়া, ভাতের সঙ্গে অতিরিক্ত তেল-চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ এবং শারীরিক পরিশ্রমের অভাব ওজন বাড়াতে পারে।
তাই ভাত পুরোপুরি বাদ দেওয়ার পরিবর্তে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ, সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও আঁশ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমের দিকে নজর দেওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিয়ম মেনে পরিমিত ভাত খেয়েও ওজন ও পেটের মেদ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
