
ডা. সাইফ হোসেন খান
সহকারী অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ, পপুলার ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ধানমন্ডি, ঢাকা
গরম গরম জিলাপি দেখলে জিবে জল আসে; কিন্তু একটি কথা প্রায়ই শুনছি, ‘জিলাপি হাইড্রোজ দিয়ে বানানো হয়, এটা খুব ক্ষতিকর।’
‘হাইড্রোজ’ আদতে কী?
বাংলাদেশে খাদ্যে ব্যবহৃত ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট বোঝানো হয়। এর আরেক নাম সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট এবং এর রাসায়নিক সংকেত Na₂S₂O₄। এটি একটি শক্তিশালী রিডিউসিং ও ব্লিচিং এজেন্ট; অর্থাৎ বিভিন্ন শিল্পপ্রক্রিয়ায় রং হালকা বা অপসারণ এবং রাসায়নিক বিক্রিয়ায় রিডিউসিং এজেন্ট হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ‘হাইড্রোজ’ শব্দটি দেখে অনেকের মনে হতে পারে, এটি বুঝি হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট বা হাইড্রোজেনেটেড তেলজাতীয় কোনো উপাদান। আদতে তা নয়। হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট এবং সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি রাসায়নিক পদার্থ।
হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাটের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় হলো ট্রান্স ফ্যাট। তরল উদ্ভিজ্জ তেলের আংশিক হাইড্রোজেনেশনের মাধ্যমে ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রান্স ফ্যাট তৈরি হতে পারে। এসব ফ্যাট অতিরিক্ত গ্রহণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়ায় বলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করেছে। কিন্তু সেটি ‘হাইড্রোজ’ নামে পরিচিত সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইটের বিষয় নয়।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্যেও খাদ্যে ক্ষতিকর ‘হাইড্রোজ’-এর রাসায়নিক সংকেত Na₂S₂O₄ দেওয়া হয়েছে। তাদের ল্যাবরেটরি তথ্যভান্ডারে ‘হাইড্রোজ’কে সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট–সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট ও সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট আদতে একই রাসায়নিক পদার্থের দুটি ভিন্ন নাম।
জিলাপিতে কেন হাইড্রোজ দেওয়া হয়?
বাংলাদেশে বিভিন্ন সময় জিলাপিসহ কিছু খাবারে হাইড্রোজ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের স্থানীয় পর্যায়ের নজরদারি ও অভিযানের তথ্যেও জিলাপিতে হাইড্রোজ ব্যবহারের বিষয়টি উঠে এসেছে।
খাবারে এটি ব্যবহারের উদ্দেশ্য হিসেবে মূলত খাবারের রং ও গঠন পরিবর্তন বা আকর্ষণীয় করার কথা বলা হয়। কিন্তু কোনো শিল্প রাসায়নিক খাবারে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখানে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
খাবারে কোনো রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে কি না, তা নির্ভর করে সেটি খাদ্য হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমোদিত কি না, কী পরিমাণে ব্যবহার করা হচ্ছে এবং কোন খাবারে কী উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে এসব বিষয়ের ওপর।
তাই শুধু জিলাপি দেখে বলা যায় না যে তাতে হাইড্রোজ আছে। নিশ্চিতভাবে জানতে হলে পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা করতে হবে।
হাইড্রোজ শরীরের জন্য কতটা ক্ষতিকর?
সোডিয়াম ডাইথায়োনাইটকে সাধারণ কোনো খাদ্য উপাদান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক কেমিক্যাল সেফটি কার্ডে এটিকে গিলে ফেললে ক্ষতিকর হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। এটি চোখ ও শ্বাসতন্ত্রে জ্বালা সৃষ্টি করতে পারে। রাসায়নিকটি শক্তিশালী রিডিউসিং এজেন্ট এবং অম্লের সংস্পর্শে এলে বিষাক্ত গ্যাস তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন (এনএলএম) পরিচালিত অনলাইন রাসায়নিক তথ্যভান্ডার পাবকেম। এই তথ্যভান্ডারে সংরক্ষিত নিরাপত্তা-তথ্যেও সোডিয়াম ডাইথায়োনাইটের ক্ষেত্রে গিলে ফেলার পর ক্ষতিকর প্রভাবের কথা উল্লেখ আছে। শরীরে প্রবেশের পর এটি স্থিতিশীল থাকে না; আর্দ্রতা ও অম্লীয় পরিবেশে এর রাসায়নিক পরিবর্তন ঘটতে পারে।
তাই শিল্পে ব্যবহৃত এই রাসায়নিক ইচ্ছাকৃতভাবে খাবারে মেশানো হলে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার কারণ নেই।
একটি জিলাপি খেলেই কি ক্ষতি হবে?
এমন নয় যে হাইড্রোজযুক্ত একটি জিলাপি খেলেই একজন সঙ্গে সঙ্গে গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়বেন। কোনো রাসায়নিকের সম্ভাব্য ক্ষতি নির্ভর করে তার পরিমাণ, শরীরে প্রবেশের মাত্রা, ব্যক্তির শারীরিক অবস্থা এবং অন্যান্য অনেক বিষয়ের ওপর।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে হাইড্রোজ মেশানো খাবার নিরাপদ। বরং বিষয়টি হলো, খাবারে থাকার কথা নয়, এমন একটি শিল্প রাসায়নিক ইচ্ছাকৃতভাবে খাবারে মেশানো হচ্ছে কি না।
তাই কোনো নির্দিষ্ট জিলাপিতে হাইড্রোজ পাওয়া গেলে ‘অল্পই তো ছিল’ বলে সেটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
জিলাপি তাহলে খাবেন না?
মাঝেমধ্যে জিলাপি খাওয়া নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে খাবারের নিরাপত্তার বিষয়টি আলাদা। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি, নিরাপদ উপাদান ব্যবহার করা খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
জিলাপি যেহেতু চিনি ও তেলে ভাজা খাবার, তাই এটি নিয়মিত বা অতিরিক্ত খাওয়ার অভ্যাসও স্বাস্থ্যকর নয়। অতিরিক্ত ফ্রি সুগার গ্রহণ সীমিত রাখার পরামর্শ দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা; একই সঙ্গে মোট খাদ্যতালিকায় স্বাস্থ্যকর চর্বিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
আর যদি কোনো খাবারে শিল্পে ব্যবহৃত হাইড্রোজ বা অন্য কোনো অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের সন্দেহ থাকে, সেটি এড়িয়ে চলাই ভালো।
তাহলে আসল কথা কী?
‘জিলাপির হাইড্রোজ’ আর ‘হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাট’ এক জিনিস নয়। বাংলাদেশের খাদ্য-প্রসঙ্গে ‘হাইড্রোজ’ বলতে সাধারণত সোডিয়াম হাইড্রোসালফাইট বা সোডিয়াম ডাইথায়োনাইট (Na₂S₂O₄) বোঝানো হয়। এটি শিল্পে ব্যবহৃত একটি রাসায়নিক, যা গিলে ফেললে ক্ষতিকর হতে পারে।
অন্যদিকে হাইড্রোজেনেটেড ফ্যাটের সঙ্গে সম্পর্কিত স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রধান বিষয় হলো ইন্ডাস্ট্রিয়াল ট্রান্স ফ্যাট। সেটিও আলাদা একটি বিষয় এবং অতিরিক্ত গ্রহণ হৃদ্রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
তাই জিলাপি নিয়ে ভয় পাওয়ার চেয়ে বিষয়টি সঠিকভাবে জানা বেশি জরুরি। জিলাপিতে হাইড্রোজ আছে কি না, তা চোখে দেখে নিশ্চিত হওয়া যায় না; পরীক্ষার মাধ্যমেই তা নির্ণয় করতে হয়। আর খাবারে অননুমোদিত রাসায়নিক ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত হলে সেই খাবার এড়িয়ে চলাই নিরাপদ।
সূত্র: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ), পাবকেম, ইন্টারন্যাশনাল কেমিক্যাল সেফটি কার্ড, ও প্রথম আলো
