কর্পূরকান্তি থেকে দুধেরসর: ধানের নামেই লুকিয়ে মানুষের ইতিহাস

প্রথম পাঁচজন বাংলার সুগন্ধী ধানের চাল। শেষে দুজন, প্রসিদ্ধ দুধেরসর ও বালাম। নাম লিখে দিলাম। সংস্কৃতি মানে শুধু বিচ্ছিন্নভাবে কিছু নাচ গান কবিতা নয়। কৃষি থেকেই কৃষ্টি। কালচার কুলটুর কেয়ার কালটিভেশন কথাগুলো একই সূত্রে গাঁথা। পৃথিবীর তাবড় নাচ গানের ঘরাণা তৈরী হয়েছে নানাদেশের কৃষিকাজ ক্ষেতখামার থেকে। শুধু কৃষিকাজ না অন্যান্য কুটিরশিল্প হস্তশিল্প এবং সেই সংক্রান্ত শ্রম ও সমষ্টিজীবন থেকে আমাদের সংস্কৃতির জন্ম। সেটাকে একেবারে বিচ্ছিন্ন করে মাঠ থেকে আলাদা করে, কৃষিকে অসম্মান করে নজিরবিহীন আত্মহত্যা করেছি আমরা।

এর মাঝে যারা বাজার খাবার নিয়ে ভেবেছেন, গোটা জীবনটা উৎসর্গ করেছেন বীজ ও সংস্কৃতি রক্ষায়, আমাদের প্রজন্মে যারা শত বাধা পার করে এদেশে বিদেশে মানুষের ইতিহাসকে বীজ ও খাবারের ইতিহাস, বিবর্তন দিয়ে বোঝার চেষ্টা করছেন, যারা বীজ মাঠ ও সংস্কৃতির বিচ্ছিন্নতাকে মেনে না নিয়ে এদের সবাইকে এক অখন্ডতায় উপলব্ধি করার কাজে নেমেছেন তাঁদের সকলকে শুভেচ্ছা ভালোবাসা জানাই।

আমাদের সময়ের পলিটিক্স বায়োপলিটিক্স। আমাদের সময়টা ক্যাপিটালোসিন। কৃষি সবচেয়ে বড় রাজনীতি ও দুর্নীতির জায়গা। আমাদের সময়টা কৃষি ছাড়াও মানুষের আরও যত জীবিকা, আরও যত ধরণের চাষবাস, আরও যত গুহামানব, শিকারী সংগ্রাহক, যাযাবর পশুপালক তাদের সকলকে নিবিড় ও গভীরভাবে সসম্মানে অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ করবার। কোনও কিছুর জন্য, যারা এই রাস্তা বেছে নিয়েছেন তারা এ পথ ছেড়ে যাবেন না।

পুনশ্চ: দয়া করে কেউ চাল কোথায় পাবেন এই প্রশ্ন করবেন না। আমি চাল বেচিনা। পোস্টের বক্তব্যের প্রতি কোনও আগ্রহ না থাকলে এনগেজড হওয়ার কোনও দরকার নেই। হতেই পারে এসব ভাবনাচিন্তা অনেকের ভালোলাগে না। কিন্তু পোস্ট না পড়েই চাল কোথায় পাওয়া যাবে এসব জিজ্ঞেস করবেন না। আর যারা ঢেঁকিছাঁটা চাল কথাটা বলেন, তাঁদের কাছে অনুরোধ ঢেঁকি বিষয়ে একটু খোঁজ করবেন। কীভাবে তার থেকে চাল উৎপন্ন হয়, ঢেঁকি থাকলেই যে যে কেউ পাড় দিয়ে চাল চিড়া বানাতে পারে ব্যাপারটা যে এমন একেবারেই না, সেগুলো দয়া করে জানুন। জীবনে সবটাই সুইচ টেপার খেলা না। আরেকটি অনুরোধ সুইচ টেপার এই জগতে আসুন আমরা প্রশ্ন করি:

এইসব চালের নাম কেন এইরকম?

ফসলের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক কেমন হলে একজন চাষী নিজের নামে নাম না রেখে তার নাম দেয় “অলি” কিংবা তার নাম দেয় “কর্পূরকান্তি” “মালাবতী” “দুধেরসর” ইত্যাদি?

এতরকম ধান চালের দরকার কী ছিলো? একটা দুটো ধান গোটা দেশে চাষ করে মিলে পালিশ করে বেচলেই তো মিটে যেত!

শুধু ধান না। ধান গম মিলেট যব ডাল সবজি গৃহপালিত পশুপাখির এত বৈচিত্র‍্য সৃষ্টি করবার কারণ কী?

এইসব বীজ কৃষকেরা সৃষ্টি করলেন কীকরে?

কীভাবে একজন কৃষক এতগুলো ধান চাষ করেন, সেই ধান থেকে কী কী প্রক্রিয়ায় চাল হয় এবং কত স্তর অতিক্রম করে তা একজন ক্রেতার কাছে পৌঁছায়?

সব সুইচ টিপে হয় না। সুইচ এইসেদিনের। মানবসভ্যতার ইতিহাস সুইচের ইতিহাস নয়।

যে কোনও দেশের খাদ্যবৈচিত্র‍্য, খাদ্য সার্বভৌমত্বে, খাদ্যসুরক্ষা, বীজ স্বরাজ বজায় রাখার দায় কেবল কোনও চাষী সরকার বেসরকার বা বিপণন কেন্দ্রের হয় না। এর বাইরে থাকা অজস্র মানুষেরও নানা দায় থাকে। সেই দায়িত্ব পালনের মাধ্যমে সুস্থ সুন্দর সাস্টেনেবল খাদ্য বন্টন ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে এমন উদাহরণ আছে। আমরা সেক্ষেত্রে কী ভাবছি?

সূত্র: Nilanjan Mishra এর প্রোফাইল থেকে সংগৃহীত

* মতামত লেখকের নিজস্ব

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ