
লইট্টা, ছুরি, পোয়া ও ফাইস্যা মাছের শুঁটকির পাশাপাশি বাগদা ও হরিণা চিংড়ির শুঁটকিতেও মিলেছে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা। দেশের চার উপকূলীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা শুঁটকির প্রতিটি পরীক্ষিত নমুনায় এসব কণা পেয়েছেন গবেষকেরা। তবে কণার সংখ্যা বেশি হওয়া আর রাসায়নিক ঝুঁকি বেশি হওয়া এক বিষয় নয়। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি গ্রামে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা রয়েছে সুন্দরবনের দুবলার চরের লইট্টা শুঁটকিতে। অন্যদিকে, প্লাস্টিকের রাসায়নিক গঠন বিবেচনায় ঝুঁকিসূচক সবচেয়ে বেশি কুয়াকাটার নমুনায়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্যবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খানের নেতৃত্বে পরিচালিত গবেষণায় সুন্দরবনের দুবলার চর, কুয়াকাটা, কক্সবাজার ও টেকনাফের ছয় প্রজাতির শুঁটকিতে প্লাস্টিক দূষণের তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে প্রতি গ্রাম শুঁটকিতে শূন্য দশমিক ২৫ থেকে ১ দশমিক ৩০টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। শনাক্ত হয়েছে সাত ধরনের প্লাস্টিক।
গবেষণায় কণার সংখ্যা, আকার, আকৃতি ও রাসায়নিক গঠন বিশ্লেষণের পাশাপাশি সম্ভাব্য রাসায়নিক ঝুঁকিও নির্ণয় করা হয়েছে। গবেষণাটি ১৫ অক্টোবর আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘মেরিন পলিউশন বুলেটিন’-এ অনলাইনে প্রকাশিত হয়েছে।
কোন শুঁটকিতে কত প্লাস্টিক কণা
গবেষকেরা চার উপকূলীয় এলাকার শুঁটকি তৈরির স্থান থেকে নমুনা সংগ্রহ করেন। মোট ২৪টি নমুনার প্রতিটিতে ১০ গ্রাম শুকনা অংশ পরীক্ষা করা হয়।
গবেষণায় প্রতি গ্রাম শুঁটকিতে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে সুন্দরবনের দুবলার চরের লইট্টায়, ১ দশমিক ৩০টি। এরপর রয়েছে কক্সবাজারের বাগদা চিংড়ির শুঁটকি, যেখানে প্রতি গ্রামে ১ দশমিক ২৫টি কণা পাওয়া গেছে।
সুন্দরবনের পোয়া শুঁটকিতে প্রতি গ্রামে শূন্য দশমিক ৯০টি, বাগদা চিংড়িতে শূন্য দশমিক ৮০টি এবং ছুরি শুঁটকিতে শূন্য দশমিক ৬৫টি কণা পাওয়া গেছে। কক্সবাজারের পোয়া শুঁটকিতে শূন্য দশমিক ৭০টি এবং ছুরিতে শূন্য দশমিক ৫০টি কণা মিলেছে।
টেকনাফের লইট্টা শুঁটকিতে প্রতি গ্রামে শূন্য দশমিক ৭৫টি, ফাইস্যায় শূন্য দশমিক ৭০টি এবং হরিণা চিংড়িতে শূন্য দশমিক ২৫টি কণা পাওয়া গেছে। কুয়াকাটার ফাইস্যা শুঁটকিতে শূন্য দশমিক ৬৫টি এবং হরিণা চিংড়িতে শূন্য দশমিক ৫০টি কণা মিলেছে।
এলাকাভিত্তিক গড় হিসাবে সুন্দরবনের শুঁটকিতে প্রতি গ্রামে শূন্য দশমিক ৯১টি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। কক্সবাজারে এই গড় শূন্য দশমিক ৮২, কুয়াকাটায় শূন্য দশমিক ৫৮ এবং টেকনাফে শূন্য দশমিক ৫৭টি।
শনাক্ত সাত ধরনের প্লাস্টিক
শুঁটকিতে শনাক্ত সাত ধরনের প্লাস্টিকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে পলিথিন, ৩০ দশমিক ৪৯ শতাংশ। এরপর রয়েছে পলিপ্রোপিলিন, ২৪ দশমিক ৩৯ শতাংশ। এ ছাড়া পলিয়েস্টার, পলিস্টাইরিন, পলিভিনাইল ক্লোরাইডসহ আরও চার ধরনের প্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে। ব্যাগ, মোড়ক, দড়ি ও পোশাকসহ নানা পণ্য তৈরিতে এসব প্লাস্টিক ব্যবহৃত হয়।
গবেষণায় পাওয়া বেশির ভাগ কণা ছিল সূক্ষ্ম সুতার মতো। কিছু ছোট ভাঙা টুকরাও পাওয়া গেছে। কণাগুলোর বড় অংশের আকার ১৫১ থেকে ১ হাজার ৫০০ মাইক্রোমিটার। এক হাজার মাইক্রোমিটার সমান এক মিলিমিটার। নীল ও কালো রঙের কণা বেশি পাওয়া গেছে।
গবেষকেরা প্লাস্টিকের ধরন ও রাসায়নিক বিপদের মান বিবেচনায় একটি ঝুঁকিসূচক নির্ণয় করেছেন। এতে কুয়াকাটার নমুনার ঝুঁকিসূচক সর্বোচ্চ, ২ হাজার ৬৪২ দশমিক ৭। এরপর কক্সবাজারে ১ হাজার ৪৬১ দশমিক ১, টেকনাফে ১২০ দশমিক ৫ এবং সুন্দরবনে ৮৬ দশমিক ৭।
অর্থাৎ, সুন্দরবনের শুঁটকিতে প্লাস্টিক কণার গড় সংখ্যা বেশি হলেও রাসায়নিক ঝুঁকিসূচক সবচেয়ে বেশি কুয়াকাটায়। গবেষকদের মতে, কুয়াকাটা ও কক্সবাজারের নমুনায় পলিভিনাইল ক্লোরাইড ও পলিস্টাইরিনের মতো তুলনামূলক বেশি রাসায়নিক বিপদ মানসম্পন্ন প্লাস্টিক পাওয়ায় এ পার্থক্য দেখা গেছে।
প্রধান গবেষক অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান বলেন, ‘শুঁটকিতে কতটি প্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে, শুধু তা দিয়ে দূষণের ঝুঁকি বোঝা যায় না। কণাগুলো কোন ধরনের প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।’
প্লাস্টিক আসছে কোথা থেকে
পাঁচ মিলিমিটারের চেয়ে ছোট প্লাস্টিক কণাকে মাইক্রোপ্লাস্টিক বলা হয়। বড় প্লাস্টিক ভেঙে কিংবা কৃত্রিম তন্তুর কাপড়, মাছ ধরার জাল ও দড়ি থেকে এসব কণা পরিবেশে ছড়িয়ে পড়তে পারে। পানি ও খাদ্যের সঙ্গে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর শরীরেও প্রবেশ করতে পারে।
গবেষকদের মতে, শুঁটকিতে দুই পর্যায়ে প্লাস্টিক কণা মিশতে পারে। সমুদ্রে থাকার সময় মাছ পানি ও খাদ্যের সঙ্গে এসব কণা গ্রহণ করতে পারে। আবার মাছ ধরার পর শুকানো, পরিবহন ও সংরক্ষণের সময়ও প্লাস্টিক কণা যুক্ত হতে পারে।
অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান বলেন, নদী ও সাগরের প্লাস্টিক বর্জ্য ভেঙে ক্ষুদ্র কণায় পরিণত হয়। মাছ ধরার জাল ও দড়ির ক্ষয় থেকেও প্লাস্টিকের আঁশ পানিতে মেশে। অন্যদিকে, খোলা জায়গায় শুঁটকি তৈরির সময় বাতাসে ভেসে আসা কণা কিংবা পুরোনো প্লাস্টিকের চাদর থেকেও দূষণ হতে পারে।
তবে কোন পর্যায়ে কতটা প্লাস্টিক শুঁটকিতে মিশেছে, তা এই গবেষণায় নির্ণয় করা সম্ভব হয়নি।
শুঁটকির বড় বাজার, দূষণ কমানোর উপায়
বাংলাদেশে শুঁটকি জনপ্রিয় খাবার। এটি ঘিরে রয়েছে বড় বাণিজ্যও। মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে ৫১ লাখ ১১ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়েছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশে উৎপাদিত মাছের প্রায় ১৫ শতাংশ শুঁটকি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। উপকূলীয় বিভিন্ন এলাকা থেকে শুঁটকি সারা দেশে সরবরাহের পাশাপাশি বিদেশেও রপ্তানি করা হয়।
সাধারণত রোদে মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। সাগর থেকে আনার পর মাছ বাছাই ও পরিষ্কার করে বাঁশের মাচা, চাটাই কিংবা খোলা জায়গায় শুকানো হয়। মাছের আকার ও আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করে শুকাতে সাধারণত তিন থেকে সাত দিন লাগে। এরপর বস্তা বা মোড়কে ভরে বাজারে পাঠানো হয়। এসব পর্যায়ে মাছ বাতাস, ধুলাবালু ও বিভিন্ন সরঞ্জামের সংস্পর্শে আসে।
দূষণ কমাতে পরিষ্কার ও উঁচু মাচায় মাছ শুকানোর পরামর্শ দিয়েছেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আশরাফুল আজম খান। তাঁর মতে, পুরোনো প্লাস্টিকের চাদর, জাল ও দড়ির ব্যবহার এড়ানোর পাশাপাশি মাছ ধোয়ার পানি, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থার উন্নতি প্রয়োজন।
তিনি বলেন, একই মাছ শুকানোর আগে ও পরে পরীক্ষা করে দূষণের উৎস শনাক্ত করা জরুরি। এ জন্য সরকারি নজরদারি, উৎপাদনকারীদের প্রশিক্ষণ ও উন্নত শুকানোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব জানতে আরও গবেষণা দরকার। তবে সেই অপেক্ষায় না থেকে দূষণ কমানোর উদ্যোগ এখনই নেওয়া উচিত।
সূত্র: প্রথম আলো
