
শাওন বাজার থেকে আধা কেজি মাঝারি আকারের চিংড়ি কিনে এনে পরিষ্কার করার সময় দেখতে পায় প্রায় প্রতিটি চিংড়ির ভেতরে সিরিঞ্জ দিয়ে জেলির মতো পদার্থ ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না। কাটার পরই বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একজন স্বল্প আয়ের মানুষের জন্য এটি শুধু অর্থের ক্ষতি না বরং ভোক্তাদের সাথে চরম ভেজালের প্রতারণা।
এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ১লা জুলাই সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার মহিষকুড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১,৫০০ কেজি জেলি পুশ করা বাগদা চিংড়ি জব্দ করেছে র্যাব-৬, জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ। ঘটনাস্থল থেকে জেলি পুশ করার সরঞ্জাম ও তরল জেলিও উদ্ধার করে। পরে জনসম্মুখে পুরো চালান ধ্বংস করা হয়। এটি সাম্প্রতিক সময়ে দেশে ভেজালের অন্যতম বড় জব্দ অভিযানের একটি।
যদি ১,৫০০ কেজি চিংড়িতে ১০% জেলি পুশ করা হয়, তাহলে অতিরিক্ত ওজন হবে ১৫০ কেজি। প্রতি কেজি ১,০০০ টাকা দরে বিক্রি করলে সম্ভাব্য অতিরিক্ত আদায় হতে পারে প্রায় ১,৫০,০০০ টাকা (জেলি ও শ্রমের খরচ বাদে)। আর ১৫% হলে তা প্রায় ২,২৫,০০০ টাকা পর্যন্ত হতে পারে। সেই লক্ষ্যে মাসে দুটি চালান কেউ ঢাকা চট্রগ্রাম বা বড় শহরে পাঠাতে পারলেই ১৫% কমপক্ষে ৪ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা ভেজাল দিয়ে আয় হয়।
ধরা যাক, ১ কেজি মাঝারি বাগদা চিংড়ির বাজারদর ১,০০০ টাকা। যদি অসাধু ব্যবসায়ী ১০% জেলি পুশ করেন, তাহলে প্রকৃত চিংড়ি থাকবে ৯০০ গ্রাম, আর ১০০ গ্রাম হবে জেলি। ক্রেতা কিন্তু পুরো ১ কেজির দামই দেবেন। এই হিসেব শুধু একজন ভেজালকারী মাসিক হিসেবে। তাহলে একবার ভাবুন এমন ভেজালকারীর সংখ্যা যদি কমপক্ষে ৫০০ জন হয় তাহলে ভেজাল প্রতারণার লাভ দাড়ায় মাসিক ২৫ কোটি টাকা।
এর আগেও সাতক্ষীরায় একাধিকবার জেলি পুশ করা চিংড়ি জব্দ হয়েছে। ২০২৫ সালে ৪৫৫ কেজি, ২০২৪ সালে ৪০৫ কেজি এবং ২০২১ সালে ১,৩০০ কেজি অপদ্রব্য পুশ করা চিংড়ি জব্দ করে ধ্বংস করা হয়। এসব দৃশ্যমান অভিযানের ঘটনা যা দীর্ঘদিন ধরে চলা একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা। অদৃশ্যমান ৯০ ভাগ ভেজালকারীরা থেকে যায় ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এই প্রতারণার মূল উদ্দেশ্য হলো চিংড়ির ওজন কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে বেশি দামে বিক্রি করা। সিরিঞ্জ দিয়ে চিংড়ির মাথা বা দেহে নন ফুডগ্রেড জেলি, অস্বাস্থ্যকর স্টার্চজাতীয় পদার্থ বা অন্য তরল প্রবেশ করিয়ে ওজন বাড়ানো হয়। বাইরে থেকে বোঝা কঠিন হলেও কাটার পর জেলির মতো পদার্থ বের হয়ে আসে।
স্টার্চভিত্তিক জেল, খাদ্যঘনকারী (যেমন কিছু ক্ষেত্রে ক্যারাজিনান বা সিএমসি-জাতীয় পদার্থ ব্যবহারের অভিযোগ), দূষিতবরফ গলানো পানি বা লবণাক্ত দ্রবণ
কোন পদার্থ ব্যবহার হচ্ছে তা পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করলে নিশ্চিত আরও ভয়া//বহ তথ্য বেরিয়ে আসবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খাদ্যমানহীন বা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ব্যবহৃত জেলি ও অন্যান্য পদার্থ ব্যাকটেরিয়া বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়ায়। এতে খাদ্যে বিষক্রিয়া, ডায়রিয়া, বমি, পেটের সংক্রমণসহ নানা স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। আগামীতে যা দেহে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে নানান অঙ্গপ্রতঙ্গে। এছাড়া দূষিত সিরিঞ্জ ব্যবহৃত হলে অতিরিক্ত জীবাণু দূষণের আশঙ্কা থাকে যা ছড়িয়ে পড়তে পারে পরিবারের অন্য সদ্যদের মধ্যেও।
যারা ওজন বাড়ানোর জন্য চিংড়িতে জেলি পুশ করছেন, তারা একদিকে ভোক্তার অর্থ আত্মসাৎ করছেন, অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য নিয়ে খেলছে। এদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান, কঠোর কঠোর শাস্তি এবং বাজার তদারকি আরও জোরদার করা জরুরি।
বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২.৫ থেকে ৩ লাখ মেট্রিক টন চিংড়ি উৎপাদিত হয়। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাতক্ষীরা, খুলনা, বাগেরহাট, যশোর এবং দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কক্সবাজার ও চট্টগ্রাম চিংড়ি উৎপাদন ও বিপণনের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা। এসব অঞ্চলের কিছু বাজার বা সরবরাহ চেইন নিয়ে ভেজালের নানান অভিযোগের প্রশ্ন অতীত থেকেই আছে।
তথ্যসূত্র: প্রাকৃতিক হাট
