
বিষের ফাঁদে পড়েছে দেশের কৃষি। খাদ্য উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এক নিরব ঘাতক জেঁকে বসেছে কৃষিজমিতে। ফসলের পোকা মারার নামে যে বিষ ছিটানো হচ্ছে, তা এখন বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে মানুষের শরীরে। গত পাঁচ বছরে দেশে কীটনাশকের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে।
বর্তমানে দেশে বছরে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিকটন কীটনাশক ব্যবহার হয়, যার বাজারের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকায়। একই সঙ্গে বেড়েছে ভেজাল ও নিম্নমানের কীটনাশকের দৌরাত্ম্যও।
বাজারে বিদ্যমান কীটনাশকের প্রায় ৯৫ শতাংশই নিম্নমানের। এতে একদিকে যেমন কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে, অন্যদিকে মানবস্বাস্থ্য, মাটি, পানি, মাছ, পাখি ও জীববৈচিত্র্য মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে দেশে কীটনাশকের বার্ষিক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল মাত্র ৪ হাজার মেট্রিকটন। তবে সময়ের বিবর্তনে এবং আধুনিক কৃষি পদ্ধতির নামে এর পরিমাণ বর্তমানে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৪০ হাজার মেট্রিকটনে। অর্থাৎ গত ৫০ বছরে কীটনাশকের ব্যবহার বেড়েছে দশ গুণ।
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৭ সালে যেখানে ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ১১ হাজার ৩৬৭ টন, ২০২২ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৯ হাজার ২৪৩ টনে। ২০২৩ সালে এই ব্যবহারের পরিমাণ ছিল ৩৯ হাজার ১৫৭ মেট্রিকটন। মাত্র ২৫ বছরের ব্যবধানে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় ২৮ হাজার টন।
জ্যামিতিক হারে বিষের ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তা দেশের পরিবেশগত ভারসাম্যকে এক ভয়ংকর ধ্বংসের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে। বিশাল বাজারের আড়ালে ভেজাল বিষের রাজত্ব বর্তমানে দেশে কীটনাশকের বাজার যেমন বড় হয়েছে, তেমনই বেড়েছে এতে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনাও।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর (ডিএই) সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে ৮ হাজার ১৩টি কীটনাশকের নাম নিবন্ধিত রয়েছে, যার মধ্যে সরাসরি মাঠপর্যায়ে ব্যবহার হচ্ছে ৩৬৩ ধরনের পণ্য।
এই বিশাল বাজার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ৭৫৪টি আমদানিকারক ও বিপণনকারী কোম্পানি। দেশীয় উৎপাদনের পাশাপাশি চীন, ভারত, থাইল্যান্ড ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে কাঁচামাল ও প্রস্তুত কীটনাশক আমদানি করা হয়।
বাংলাদেশে কীটনাশক উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত ও বিক্রির অনুমোদন দেয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন প্লান্ট প্রোটেকশন উইং ও কীটতত্ত্ব বিভাগ। মূল নিয়ন্ত্রক সংস্থা হলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অধীনস্থ ‘পেস্টিসাইড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অ্যান্ড কোয়ালিটি কন্ট্রোল উইং’।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কোনো কোম্পানি নতুন কীটনাশক বাজারজাত করতে চাইলে প্রথমে রাসায়নিক উপাদান, কার্যকারিতা, বিষাক্ততার মাত্রা, পরিবেশগত প্রভাব ও অবশিষ্টাংশ পরীক্ষা-সংক্রান্ত তথ্য জমা দিতে হয়।
পরে ল্যাব পরীক্ষার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে ট্রায়াল হয়। কারিগরি কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে নিবন্ধন বোর্ড অনুমোদন দেয়। তবে পরিবেশবিদ ও বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, বাস্তবে তদারকির ঘাটতি ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর কারণে অনেক নিম্নমানের পণ্য বাজারে ঢুকে পড়ছে।
মুনাফাখোর সিন্ডিকেট মেয়াদোত্তীর্ণ রাসায়নিক নতুন মোড়কে বিক্রি করছে অথবা অনুমোদনহীন উপাদানের সংমিশ্রণে ভেজাল কীটনাশক তৈরি করে কৃষকদের হাতে তুলে দিচ্ছে। এই ভেজাল কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পোকা তো মরছেই না, উল্টো জমির স্বাভাবিক উর্বরতা চিরতরে হারিয়ে যাচ্ছে।
সেন্টার ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড বায়োসায়েন্স ইন্টারন্যাশনালের (কেবি) প্রকল্প সমন্বয়ক ড. দিলরুবা শারমিন জানান, দেশে পাঁচ হাজার কোটি টাকার কীটনাশকের বাজার রয়েছে। কীটনাশক ব্যবহারের কারণে ক্যানসার রোগীর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। দেশের প্রায় ৯৫ শতাংশ কীটনাশক নিম্নমানের।
২০২৩ সালে মানহীন এমন ৪০টি কীটনাশকের অনুমোদন বাতিল করে সরকার। আর কীটনাশক ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিরাপত্তাসামগ্রী পরিধান না করায় কৃষকদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ছে। দেশে বর্তমানে ১১০টি বায়ো-পেস্টিসাইড নিবন্ধিত রয়েছে। তবে নিরাপদ বিকল্প ব্যবহারের হার এখনও খুবই কম।
তিনি বলেন, শুধু দানাদার ফসল বা শাকসবজিতেই এই বিষ সীমাবদ্ধ নেই। নদী-নালা ও জলাশয়ে সরাসরি এই বিষাক্ত রাসায়নিক মিশে যাওয়ায় মাছের প্রজনন ক্ষমতাও নষ্ট হয়ে যাচ্ছে ও মাছ মারা যাচ্ছে। এমনকি মাছের শুঁটকি সংরক্ষণেও এখন সরাসরি উচ্চমাত্রার কীটনাশক প্রয়োগ করা হচ্ছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য এক মারাত্মক টাইমবোম হিসেবে কাজ করছে। অনিয়ন্ত্রিত এই রাসায়নিকের ব্যবহার কেবল মানুষের জীবনই নয়, পুরো বাস্তুসংস্থানকেই তছনছ করে দিচ্ছে। প্রকৃতিতে উপকারী পোকা ও মৌমাছি, যারা পরাগায়নের মাধ্যমে ফসল উৎপাদনে সহায়তা করে, তারা এখন বিলুপ্তির পথে।
ডিএইর সাবেক মহাপরিচালক আব্দুল মুঈদ সম্প্রতি ‘পেস্টিসাইড রিস্ক রিডাকশন’ শীর্ষক এক কর্মশালায় ভয়াবহ তথ্য প্রকাশ করে জানিয়েছেন, দেশে বর্তমানে ক্যানসারে আক্রান্ত রোগীদের ৬৪ শতাংশই কৃষক। জমিতে বিষ প্রয়োগের সময় ন্যূনতম নিরাপত্তাসামগ্রী ব্যবহার না করার ফলে তারা সরাসরি এই বিষের কবলে পড়ছেন।
বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, গ্রামবাংলার প্রায় প্রতিটি ঘরেই একজন করে ক্যানসার রোগী পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, কীটনাশকের ব্যবহার পোকা-মাকড় নিয়ন্ত্রণের জন্য হলেও এটি মানবস্থাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। কেননা কীটনাশক ব্যবহারের কারণে অনেক রোগবালাইয়ের জন্ম হচ্ছে। তাই আমাদের খাদ্যনিরাপত্তার সঙ্গে স্বাস্থ্যের বিষয়টিও দেখতে হবে।
পরিবেশবিদরা বলছেন, অনিয়ন্ত্রিত কীটনাশক ব্যবহার শুধু মানুষের স্বাস্থ্য নয়, পুরো পরিবেশ ব্যবস্থাকেই হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। উন্নত বিশ্ব যেসব রাসায়নিক নিষিদ্ধ করেছে, তার কিছু এখনও আমাদের দেশে ব্যবহার হচ্ছে। এতে মাটি, পানি ও খাদ্যশৃঙ্খল দূষিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক শরীফ জামিল বলেন, নদী-খাল ও জলাশয়ে কীটনাশকের প্রবাহ বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে মাছ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে। পাখি ও উপকারী কীটপতঙ্গ কমে যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও হুমকি।
তিনি বলেন, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম), জৈব কৃষি ও বায়ো-পেস্টিসাইড ব্যবহারে সরকারকে আরও জোর দিতে হবে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম জানান, কৃষকের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে দেশের বাজারে ভেজাল ও নিম্নমানের বালাইনাশক বা কীটনাশক নিয়ন্ত্রণে ডিএই অত্যন্ত তৎপর এবং নিয়মিত তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
উপজেলা পর্যায়ে নিয়োজিত পেস্টিসাইড ইন্সপেক্টর, উপজেলা কৃষি অফিসার এবং উপ-সহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তারা (এসএপিপিও) নিয়মিতভাবে বাজার এবং ডিলারের দোকানগুলো মনিটর করছেন।
এই তদারকির অংশ হিসেবে তারা নিয়মিত মাঠ পর্যায় থেকে কীটনাশকের নমুনা সংগ্রহ করে অধিদফতরের প্রধান কার্যালয়ের ল্যাবে পরীক্ষার জন্য পাঠান। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর যেসব নমুনা মানোত্তীর্ণ হতে পারে না বা ‘ডিসকোয়ালিফাই’ হয়, সেগুলোর বিষয়ে দ্রুত আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়।
মহাপরিচালক বলেন, পরীক্ষায় নিম্নমান প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিকে বাজার থেকে ওই পণ্যটি তাৎক্ষণিকভাবে সরিয়ে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সরকারি বিধি মোতাবেক সেগুলো ধ্বংস করা হয়। অধিদফতরের প্লান্ট প্রোটেকশন উইং এই পুরো প্রক্রিয়াটি সরাসরি তত্ত্বাবধান করে থাকে বলে জানান তিনি।
মহাপরিচালক জানান, গত মাসে সংগৃহীত প্রায় ৪০০টি নমুনার মধ্যে প্রায় ৪৩ থেকে ৪৫টির মতো নমুনা নিম্নমানের হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আইন অমান্য করে মানহীন পণ্য বাজারে ছাড়ার চেষ্টা করে, তবে অধিদফতরের নজরদারিতে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
তথ্যসূত্র: দৈনিক সময়ের আলো
