
বাংলাদেশের কৃষি আজ এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে খাদ্য উৎপাদনের চ্যালেঞ্জ, অন্যদিকে কৃষিতে অতিরিক্ত কীটনাশক ও তামাক চাষের বিস্তার জনস্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য দীর্ঘমেয়াদী হুমকি হয়ে উঠছে।
দেশে ক্যান্সারে আক্রান্ত প্রতি ১০ জন রোগীর মধ্যে ৬ জনই সরাসরি কৃষিকাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি রাসায়নিকের সংস্পর্শে থাকা এ ঝুঁকি বাড়ানোর অন্যতম কারণ হতে পারে। তাই নিরাপদ কীটনাশক ব্যবহার, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (PPE) পরিধান এবং নিরাপদ কৃষি চর্চা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করা হচ্ছে।
এদিকে পার্বত্য অঞ্চলে তামাক চাষের বিস্তার নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, পরিবেশবিদ ও জনস্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্বেগও বাড়ছে। তাদের মতে, তামাক চাষের কারণে মাটির উর্বরতা কমে যাচ্ছে, কৃষিজমির স্বাভাবিক উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে।
অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যই নয়, জলজ পরিবেশের জন্যও মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। নদী, খাল ও জলাশয়ে রাসায়নিক মিশে মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব পড়ছে মৎস্যসম্পদ এবং গ্রামীণ অর্থনীতির ওপর।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘদিন কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকা কৃষক ও কৃষিশ্রমিকদের মধ্যে ক্যান্সারসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদী রোগের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে। একই সঙ্গে মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপরও বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তামাক চাষের আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বনাঞ্চলে। তামাক প্রক্রিয়াজাতকরণে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের কারণে বন উজাড়ের প্রবণতা বাড়ছে, যা জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও পরিস্থিতি সুখকর নয়। অনেক কৃষক লাভের আশায় তামাক চাষে যুক্ত হলেও ঋণনির্ভর উৎপাদন ব্যবস্থার কারণে দীর্ঘমেয়াদে অনেক পরিবার ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি গৃহপালিত প্রাণিসম্পদের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। নিরাপদ কৃষি প্রযুক্তির প্রসার, কৃষকদের প্রশিক্ষণ, সুরক্ষা সরঞ্জামের ব্যবহার নিশ্চিত করা, তামাকের পরিবর্তে লাভজনক বিকল্প ফসল চাষে প্রণোদনা এবং পরিবেশবান্ধব কৃষিনীতি বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি।
আজকের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে আগামী প্রজন্মের ভবিষ্যৎ। এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জনস্বাস্থ্য, কৃষি, পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর এই সংকট আরও গভীর হতে পারে।
