কফি পান করা বিষয়ে গবেষণায় মিলল কিছু বিস্ময়কর তথ্য

অনেকের দিনের শুরুই হয় এক কাপ কফি দিয়ে। কেউ ঘুম কাটাতে, কেউ মনোযোগ বাড়াতে, আবার কেউ কাজের চাপ সামলাতে কফির ওপর নির্ভর করেন। তবে কফির প্রভাব কি শুধুই ক্যাফেইনের কারণে? নতুন এক গবেষণা বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। গবেষকদের মতে, কফি শুধু মস্তিষ্কেই নয়, অন্ত্রের উপকারী অণুজীবের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। আর সেই পরিবর্তনের মাধ্যমে মানুষের মেজাজ, মনোযোগ ও স্মৃতিশক্তির ওপরও প্রভাব পড়তে পারে।

অন্ত্র-মস্তিষ্কের সম্পর্ক বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই জানেন, মানুষের অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি জটিল যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে বলা হয় ‘অন্ত্র-মস্তিষ্ক অক্ষ’। এই যোগাযোগে স্নায়ুতন্ত্র, হরমোন, রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং অন্ত্রে বসবাসকারী কোটি কোটি উপকারী অণুজীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এসব অণুজীব খাবার ভেঙে এমন কিছু রাসায়নিক তৈরি করে, যা প্রদাহ, মানসিক চাপ, আবেগ ও চিন্তাশক্তিকে প্রভাবিত করতে পারে। তবে গবেষকেরা বলছেন, কোনো একটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াই মানুষের সুখ বা দুঃখ নিয়ন্ত্রণ করে না; বরং খাদ্যাভ্যাস, ঘুম, মানসিক চাপ, ওষুধ ও জিনগত বৈশিষ্ট্য—সবকিছু মিলেই এই প্রক্রিয়া কাজ করে।

কেন কফি নিয়ে গবেষণা?

কফিতে ক্যাফেইনের পাশাপাশি শত শত জৈব-সক্রিয় উপাদান রয়েছে। এর মধ্যে পলিফেনলের মতো কিছু যৌগ বৃহদান্ত্রে পৌঁছে উপকারী অণুজীবের খাদ্য হিসেবে কাজ করতে পারে। ফলে অন্ত্রের অণুজীবের গঠন ও কার্যক্রমে পরিবর্তন আসে, যার প্রভাব শেষ পর্যন্ত মস্তিষ্কেও পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন গবেষকেরা।

যেভাবে হয়েছে গবেষণা

আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের গবেষকেরা ৬২ জন প্রাপ্তবয়স্ককে নিয়ে এই গবেষণা পরিচালনা করেন। অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৩১ জন নিয়মিত কফি পান করতেন এবং বাকি ৩১ জন কফি পান করতেন না। গবেষণায় অংশগ্রহণকারীদের মেজাজ, মানসিক চাপ, মনোযোগ, স্মৃতিশক্তি ও অন্যান্য জ্ঞানীয় সক্ষমতা মূল্যায়নের পাশাপাশি তাদের মল ও প্রস্রাবের নমুনা বিশ্লেষণ করে অন্ত্রের অণুজীব ও বিভিন্ন রাসায়নিক পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করা হয়। নিয়মিত কফি পানকারীদের প্রথমে দুই সপ্তাহ কফি থেকে বিরত রাখা হয়। এরপর তাদের একদলকে ক্যাফেইনযুক্ত এবং অন্য দলকে ক্যাফেইনমুক্ত কফি তিন সপ্তাহ পান করানো হয়।

গবেষণায় যা পাওয়া গেছে

গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের অন্ত্রের অণুজীবের গঠন অন্যদের তুলনায় ভিন্ন ছিল। কফি পান বন্ধ করার পর কিছু পরিবর্তন আগের অবস্থায় ফিরতে শুরু করে। পরে আবার কফি পান শুরু করলে অন্ত্রের অণুজীবে নতুন পরিবর্তন দেখা যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই পরিবর্তনের কিছু অংশ ক্যাফেইনযুক্ত ও ক্যাফেইনমুক্ত—দুই ধরনের কফির ক্ষেত্রেই দেখা গেছে। অর্থাৎ শুধু ক্যাফেইন নয়, কফির অন্যান্য উপাদানও এতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

ক্যাফেইনযুক্ত বনাম ক্যাফেইনমুক্ত

কফি গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ক্যাফেইনযুক্ত কফি মনোযোগ ও সতর্কতা বাড়াতে তুলনামূলক বেশি কার্যকর এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে উদ্বেগও কিছুটা কম দেখা গেছে। অন্যদিকে, ক্যাফেইনমুক্ত কফি শেখা ও স্মৃতিশক্তির কিছু ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দিয়েছে। এছাড়া উভয় দলই মানসিক চাপ ও বিষণ্নতার উপসর্গ কিছুটা কম অনুভব করেছেন বলে জানিয়েছেন।

সব ফল ইতিবাচক নয়

গবেষণায় আরও দেখা গেছে, নিয়মিত কফি পানকারীদের মধ্যে আবেগগত প্রতিক্রিয়া ও হঠকারিতার প্রবণতা তুলনামূলক বেশি ছিল। অন্যদিকে, যারা কফি পান করতেন না, তারা কিছু স্মৃতিনির্ভর পরীক্ষায় ভালো ফল করেছেন। গবেষকদের মতে, এর পেছনে ব্যক্তিগত অভ্যাস, ক্যাফেইনের সহনশীলতা কিংবা কফি না খাওয়ার প্রভাবসহ বিভিন্ন কারণ কাজ করতে পারে।

চিকিৎসা নয়, পরিমিত অভ্যাস

গবেষকেরা স্পষ্ট করেছেন, এই গবেষণার ভিত্তিতে বিষণ্নতা, উদ্বেগ বা স্মৃতিশক্তির সমস্যার চিকিৎসা হিসেবে কফি পান শুরু করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বরং অতিরিক্ত ক্যাফেইন অনেকের ক্ষেত্রে উদ্বেগ, অনিদ্রা, বুক ধড়ফড় বা হজমের সমস্যা বাড়িয়ে দিতে পারে। তাই কফিকে ওষুধ নয়, বরং এমন একটি খাদ্য উপাদান হিসেবে দেখা উচিত, যার প্রভাব ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন হতে পারে। নতুন এই গবেষণা ইঙ্গিত দিচ্ছে, কফির প্রভাব শুধু ঘুম তাড়ানো বা সাময়িকভাবে সতেজ করে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্ত্রের অণুজীব, শরীরের বিপাকক্রিয়া এবং মস্তিষ্কের জটিল সম্পর্কেও কফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে বিষয়টি এখনও গবেষণার পর্যায়ে থাকায় এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

সূত: আরটিভি

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ