
কেউ যদি নিরামিষভোজী হয়, তাহলে হয়তো মাংসের স্বাদ বা গন্ধ তার কাছে তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের কাছে মাংস কেবল একটি খাবার নয়, বরং খাদ্যসংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
সমস্যা হলো, মাংস উৎপাদনের জন্য গবাদিপশু পালন পরিবেশের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে। বিশাল পরিমাণ জমি, পানি ও খাদ্যের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে ছড়ায় বিপুল পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম কারণ।
তাই বহু বছর ধরেই বিজ্ঞানীরা এমন একটি উপায় খুঁজছেন, অন্য কোনোভাবে মাংসের স্বাদ ও পুষ্টিগুণের কিছু অংশ পাওয়া যাবে, কিন্তু পশুপালনের প্রয়োজন হবে না।
সেই পথেই এবার বড় একটি অগ্রগতির খবর দিলেন গবেষকেরা।
প্রথমবারের মতো বিজ্ঞানীরা লেটুস ও তামাকগাছে সফলভাবে তৈরি করেছেন মায়োগ্লোবিন। এটি হলো মাংসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাণিজ প্রোটিন।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ফ্রন্টায়ার্স ইন প্লানেট সায়েন্স জার্নালে।
মাংসের লালচে রং, রান্নার সময় তৈরি হওয়া পরিচিত স্বাদ ও গন্ধের পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে মায়োগ্লোবিনের।
এটি মূলত প্রাণীর পেশিতে থাকা একটি প্রোটিন, যা অক্সিজেন সংরক্ষণে সাহায্য করে। একই সঙ্গে মাংসের রং, স্বাদ ও রান্নার সময় তৈরি হওয়া বিশেষ সুবাসের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
উদ্ভিদে স্বাভাবিকভাবে এই প্রোটিন তৈরি হয় না। তাই এত দিন উদ্ভিদভিত্তিক মাংসের বিকল্প খাবারে মায়োগ্লোবিনের ঘাটতি থেকেই যেত।
কীভাবে সম্ভব হলো এই সাফল্য
গবেষণার নেতৃত্ব দেন লন্ডনের ইম্পেরিয়াল কলেজের উদ্ভিদ জৈবপ্রযুক্তিবিদ অ্যালেক্সিয়া গ্রফ।
গবেষকেরা বায়োলিস্টিক ট্রান্সফরমেশন নামে একটি প্রযুক্তি ব্যবহার করেন। সহজ ভাষায়, এটি একটি বিশেষ ধরনের ‘জিন গান’। এই যন্ত্রের সাহায্যে মাংসের মায়োগ্লোবিন তৈরির জিন লেটুস ও তামাকগাছের ক্লোরোপ্লাস্টে প্রবেশ করানো হয়।
এরপর পরীক্ষা করে দেখা যায়, উদ্ভিদগুলো কেবল সেই প্রোটিনই তৈরি করেনি, বরং পরবর্তী প্রজন্মের বীজেও সেই জিন বহন করেছে। অর্থাৎ পরিবর্তনটি স্থায়ীভাবে উদ্ভিদের বংশধরদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে।
গাছের কোনো ক্ষতি হয়নি
গবেষকদের অন্যতম বিস্ময় ছিল, মায়োগ্লোবিন তৈরি করলেও গাছগুলোর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়নি। গাছগুলো সুস্থভাবে বেড়েছে, ফুল-ফল ও বীজ উৎপাদন করেছে। এমনকি সালোকসংশ্লেষণেও উল্লেখযোগ্য কোনো সমস্যা দেখা যায়নি।
অ্যালেক্সিয়া গ্রফের ভাষায়, গবেষণায় তারা প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফল পেয়েছে।
কতটা প্রোটিন তৈরি হয়েছে
পরীক্ষায় দেখা গেছে, প্রতি কেজি শুকনো লেটুসে প্রায় ৮১০ মিলিগ্রাম এবং প্রতি কেজি শুকনো তামাকগাছে প্রায় ৮০০ মিলিগ্রাম মায়োগ্লোবিন তৈরি হয়েছে। অবশ্য এটি প্রাণীর মাংসে থাকা মায়োগ্লোবিনের তুলনায় প্রায় দশ গুণ কম।
তবে গবেষকদের মতে, শুধু উৎপাদনের পরিমাণ দিয়ে বিষয়টি বিচার করলে হবে না।
কারণ গবাদিপশু পালনের তুলনায় উদ্ভিদ চাষে অনেক কম জমি, পানি ও শক্তি লাগে। ফলে এক হেক্টর জমি থেকে দীর্ঘমেয়াদে যে পরিমাণ প্রোটিন পাওয়া সম্ভব, তা পশুপালনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে পারে এমন সম্ভাবনাও দেখছেন তারা।
ভবিষ্যতে কী হতে পারে
এই প্রযুক্তি সফল হলে লেটুসের পাতা থেকে মায়োগ্লোবিন আলাদা করে উদ্ভিদভিত্তিক মাংস তৈরিতে ব্যবহার করা যেতে পারে। আবার ভবিষ্যতে এমনও হতে পারে, বিশেষভাবে উন্নত এই লেটুসই সরাসরি খাদ্য হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।
তবে গবেষকেরা এটিকে এখনই বাণিজ্যিক সাফল্য বলতে রাজি নন।
তাদের মতে, এটি মূলত একটি ‘প্রুফ অব প্রিন্সিপল’, অর্থাৎ প্রযুক্তিটি যে বাস্তবে কাজ করে, সেটিই প্রথমবারের মতো দেখানো হয়েছে।
এখনো উদ্ভিদে আরও বেশি পরিমাণ মায়োগ্লোবিন তৈরির উপায় বের করতে হবে। পাশাপাশি নিশ্চিত করতে হবে, প্রোটিনটি সম্পূর্ণ কার্যকরভাবে তৈরি হচ্ছে কি না।
গবেষকেরা বলছেন, ভবিষ্যতে শুধু মায়োগ্লোবিন নয়, আরও অনেক গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপ্রোটিন উদ্ভিদের মাধ্যমে উৎপাদনের সম্ভাবনাও রয়েছে।
লেটুসে মাংসের গুরুত্বপূর্ণ প্রোটিন উৎপাদনের এই সাফল্য হয়তো এখনো গবেষণাগারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ভবিষ্যতে আমাদের খাদ্যতালিকায় এমন উদ্ভিদভিত্তিক খাবার জায়গা করে নিতে পারে যা স্বাদে-গন্ধে মাংসের কাছাকাছি থাকবে। তবে পরিবেশের ওপর চাপ অনেক কমবে।
সূত্র: Daily Star বাংলা
