
দিনের শুরুতে এক কাপ কফি কিংবা গ্রিন টি পান করেন অনেকেই। কেউ পান করেন সতেজ থাকতে, আবার কেউ হৃদ্স্বাস্থ্য ভালো রাখা বা উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার আশায়। তবে উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের জন্য কফি নাকি গ্রিন টি, কোনটি তুলনামূলকভাবে বেশি উপকারী, তা নিয়ে দীর্ঘদিনের প্রশ্ন রয়েছে। সম্প্রতি প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় এ বিষয়ে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উঠে এসেছে।
গবেষণাটি জাপান কোলাবরেটিভ কোহর্ট স্টাডি ফর ইভ্যালুয়েশন অব ক্যানসার রিস্কের আওতায় পরিচালিত হয়। গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে Journal of the American Heart Association-এ। এতে প্রায় ১৮ হাজার মানুষকে ১২ বছর ধরে পর্যবেক্ষণ করা হয়। নিয়মিত কফি ও গ্রিন টি পান এবং এর সঙ্গে রক্তচাপ ও হৃদ্স্বাস্থ্যের সম্পর্ক রয়েছে কি না, সেটিই ছিল গবেষকদের অন্যতম লক্ষ্য।
গবেষণায় ক্যাফেইনের বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে। সাধারণত এক কাপ কফিতে প্রায় ৯৫ থেকে ২০০ মিলিগ্রাম ক্যাফেইন থাকতে পারে। বিপরীতে এক কাপ গ্রিন টিতে থাকে প্রায় ৩৫ মিলিগ্রাম। অর্থাৎ একই পরিমাণ পানীয়তে কফিতে গ্রিন টির তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ক্যাফেইন থাকতে পারে।
ক্যাফেইন কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সাময়িকভাবে রক্তচাপ বাড়াতে পারে। তাই উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের অতিরিক্ত কফি পান করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়।
গবেষণার ফল অনুযায়ী, উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে গ্রিন টি কফির তুলনায় তুলনামূলকভাবে অনুকূল বলে দেখা গেছে। বিশেষ করে যাদের রক্তচাপ অনেক বেশি, তাদের মধ্যে কফি পান এবং মৃত্যুঝুঁকি বৃদ্ধির মধ্যে একটি সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গ্রিন টি পানকারীদের ক্ষেত্রে একই ধরনের সম্পর্ক দেখা যায়নি।
গবেষকদের ধারণা, গ্রিন টিতে থাকা ক্যাটেচিন ও অন্যান্য পলিফেনল এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখতে পারে। এসব যৌগ অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং হৃদ্যন্ত্রের ওপর সম্ভাব্য উপকারী প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে গবেষণার ফলের অর্থ এই নয় যে কফি পান করলেই হৃদ্যন্ত্রের ক্ষতি হবে কিংবা গ্রিন টি পান করলেই উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে। ব্যক্তিভেদে ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা, পানীয় গ্রহণের পরিমাণ, খাদ্যাভ্যাস, জীবনযাপন ও অন্যান্য স্বাস্থ্যগত বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
গ্রিন টির আরও সম্ভাব্য উপকার
বিভিন্ন গবেষণায় গ্রিন টি পানের আরও কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্য উপকারের কথা উঠে এসেছে। গ্রিন টিতে থাকা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে অক্সিডেটিভ ক্ষতি থেকে সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে। এ ছাড়া এর কিছু উপাদান রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা, মস্তিষ্কের স্বাস্থ্য ও বিপাকক্রিয়ার ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
গ্রিন টির ক্যাটেচিন ও অন্যান্য যৌগ মস্তিষ্কের স্বাস্থ্যের জন্যও সম্ভাব্য উপকারী বলে মনে করা হয়। পাশাপাশি বিপাকক্রিয়া ও চর্বি ব্যবহারে সামান্য প্রভাব ফেলে ওজন নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করতে পারে। তবে গ্রিন টি কোনো ‘ম্যাজিক’ ওজন কমানোর পানীয় নয়।
এ ছাড়া গ্রিন টির কিছু উপাদান মুখের ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি কমাতে সহায়তা করতে পারে। ফলে মুখের স্বাস্থ্য ভালো রাখতেও এর সম্ভাব্য ভূমিকা রয়েছে। কিছু গবেষণায় গ্রিন টি পান এবং ইনসুলিন সংবেদনশীলতার মধ্যেও ইতিবাচক সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে উচ্চ রক্তচাপ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে কফির তুলনায় গ্রিন টি তুলনামূলকভাবে ভালো বিকল্প হতে পারে বলে গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে। তবে কোনো পানীয়কেই উচ্চ রক্তচাপ বা হৃদ্রোগের চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। সুস্থ থাকতে সুষম খাদ্য, নিয়মিত শরীরচর্চা, পর্যাপ্ত ঘুম ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ওষুধ গ্রহণের পাশাপাশি পরিমিত পরিমাণে উপযুক্ত পানীয় বেছে নেওয়াই গুরুত্বপূর্ণ।
