
দাম বাড়ার আশায় মাসের পর মাস হিমাগারে আলু সংরক্ষণ করে এখন মূলধন হারানোর শঙ্কায় পড়েছেন জয়পুরহাটের আলু ব্যবসায়ী ও কৃষকেরা। বাজারে দরপতনের পাশাপাশি ক্রেতা সংকট দেখা দেওয়ায় কম দামেও মজুত আলু বিক্রি করতে পারছেন না তারা। এতে একদিকে বাড়ছে লোকসান, অন্যদিকে দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা আলু নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও তৈরি হয়েছে।
জেলার আক্কেলপুর উপজেলার গোপীনাথপুর কোল্ড স্টোরেজ ও দীনা কোল্ড স্টোরেজে বর্তমানে প্রায় ১ লাখ ৭৭ হাজার বস্তা আলু মজুত রয়েছে। হিমাগার ও ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমান বাজারদর এবং সংরক্ষণ খরচ বিবেচনায় প্রতি বস্তায় গড়ে ২৮০ থেকে ৩০৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান হচ্ছে। দুই হিমাগারে মজুত আলুতে সম্ভাব্য লোকসানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ কোটি ৩৯ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। বাজারদর আরও কমলে লোকসানের পরিমাণও বাড়বে।
হিমাগার ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাধারণত একটি বস্তায় ৬৫ কেজি আলু রাখা হয়। বাছাই ও নষ্ট আলু বাদ দেওয়ার পর বিক্রিযোগ্য থাকে প্রায় ৬০ কেজি। প্রতি বস্তা আলু কিনতে গড়ে ৫০০ টাকা, পরিবহন খরচ ৬০ টাকা, হিমাগার ভাড়া ৪০০ টাকা এবং বস্তার জন্য ১২৫ টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে প্রতি বস্তায় ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৮৫ টাকা।
অন্যদিকে, বর্তমানে ৬০ কেজির এক বস্তা আলু ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ফলে প্রতি বস্তায় ২৮০ থেকে ৩০৫ টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
গোপীনাথপুর বাজারের আলু ব্যবসায়ী বাবু মন্ডল বলেন, আগের মৌসুমেও ভালো দাম পাননি। এবার দাম বাড়ার আশায় গোপীনাথপুর কোল্ড স্টোরেজে ১ হাজার বস্তা আলু সংরক্ষণ করেছিলেন। কিন্তু বাজারে অস্বাভাবিক দরপতন ও ক্রেতা সংকটে সেই মজুত এখন লোকসানের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তিনি বলেন, আলু কেনা থেকে হিমাগারে রাখা পর্যন্ত প্রতি কেজিতে প্রায় ২৩ টাকা খরচ হয়েছে। অথচ এখন বাজারে ১২ থেকে সাড়ে ১২ টাকা কেজি দরে বিক্রি করতে হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা হিমাগারে আলু সংরক্ষণে আগ্রহ হারাবেন। একই সঙ্গে কৃষকেরাও আগামী মৌসুমে আলু চাষে ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে প্রায় ১০ থেকে ১৩ টাকা। এর সঙ্গে বাছাই, বস্তাবন্দি, পরিবহন, শ্রমিকের মজুরি ও হিমাগার ভাড়া যোগ করলে মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ২৩ টাকা কেজি। অথচ পাঁচ মাস হিমাগারে রাখার পরও সেই আলু এখন পাইকারি বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২ থেকে সাড়ে ১২ টাকা কেজি দরে।
আক্কেলপুরের কৃষক বেলাল হোসেন এবার পাঁচ বিঘা জমিতে আলু চাষ করেছেন। এতে তার প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ার আশায় তিনি একপর্যায়ে আলু বিক্রি না করে হিমাগারে সংরক্ষণ করেন। কিন্তু বাজারে দাম না বাড়ায় এখন সেই আলু বিক্রি করতে গিয়ে বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, শুধু বাজারদর কমে যাওয়াই নয়, আলুর ক্রেতাও কমেছে। ফলে কম দামে বিক্রি করেও কাঙ্ক্ষিত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। এতে একদিকে হিমাগারে সংরক্ষণের খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন মজুত থাকা আলু নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে।
উপজেলা কৃষি দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে আক্কেলপুর উপজেলায় ৬ হাজার ৬০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হয়। ওই মৌসুমে উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ১১০ মেট্রিক টন। ২০২৫-২৬ মৌসুমে আলু চাষ হয়েছে ৫ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে এবং উৎপাদন হয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ৪০৬ মেট্রিক টন।
অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে উপজেলায় আলু চাষের জমি কমেছে ৮০০ হেক্টর। আগের মৌসুমের গড় ফলন অনুযায়ী, ওই ৮০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষ হলে আরও প্রায় ১ হাজার ৬৫৬ মেট্রিক টন আলু উৎপাদন হতে পারত।
গোপীনাথপুর হিমাগারের ব্যবস্থাপক রবিউল ইসলাম বলেন, বাজারে আলুর দরপতনের প্রভাব হিমাগারেও পড়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা ব্যাপক লোকসানে পড়েছেন। এ কারণে তারা হিমাগার থেকে আলু উত্তোলনও কমিয়ে দিয়েছেন। গত বছর এ সময়ে ৬০ থেকে ৭০ হাজার বস্তা আলু উত্তোলন হয়েছিল। এবার এখনো বিপুল পরিমাণ আলু হিমাগারে রয়ে গেছে।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. মেহেদী হাসান বলেন, এ বছর উৎপাদন বেশি হওয়ায় বাজারে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ বেড়েছে। কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হিমাগার ভাড়া কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতি কেজি আলুর জন্য ৫ টাকা করে ভাড়া নির্ধারণের বিষয়েও সুপারিশ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, সরকারিভাবে আলু কেনার বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে ২০৫০ সালের মধ্যে আলু রপ্তানি বাড়ানো ও বিকল্প বাজার তৈরির লক্ষ্যে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
কৃষক ও ব্যবসায়ীদের দাবি, বর্তমান সংকট কাটাতে দ্রুত আলুর চাহিদা বাড়ানো, সরকারি উদ্যোগে ন্যায্যমূল্যে আলু কেনা এবং নতুন বাজার ও রপ্তানির সুযোগ তৈরি করা জরুরি। তা না হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়বেন। একই সঙ্গে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে আগামী মৌসুমের আলু উৎপাদনেও।
