
বিভিন্ন সময়ে পরিচালিত অভিযান, ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং প্রকাশিত সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, কিছু অসাধু চক্র সয়াবিন তেল, পামওয়েল, জেলি, ডিটারজেন্ট, হাইড্রোজ, সোডা, চিনি, লবণ, আরও অন্যান্য রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে কৃত্রিম দুধ তৈরির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে ধরা পড়ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এই রাসায়নিক কৃত্রিম দুধ তৈরিতে মণ প্রতি খরচ হয় মাত্র ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। এরপর সেই নকল দুধ আসল দুধের সঙ্গে মিশে বাজারে বিক্রি হয় ১,৬০০ টাকার দুধ হিসেবেই। অর্থাৎ প্রতি মণে প্রায় ১,২০০ টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত লাভের সুযোগ তৈরি হয়। যখন প্রতিদিন হাজার হাজার মণ দুধ কেনাবেচা হয়, তখন এই অবৈধ মুনাফার পরিমাণ কত বড় হতে পারে, তা সহজেই অনুমান করা যায়।
সাম্প্রতিক সরকারি প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সিরাজগঞ্জ ও পাবনা জেলায় মিলিয়ে প্রতিদিন প্রায় ৩৪ লাখ (৩.৪ মিলিয়ন) লিটার দুধ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে সিরাজগঞ্জে প্রায় ১৯ লাখ লিটার এবং পাবনায় প্রায় ১৫ লাখ লিটার, দুধকে মণে রূপান্তর করলে ১ মণ = ৪০ কেজি/লিটার হিসেবে ধরা হলে, দৈনিক উৎপাদন- সিরাজগঞ্জ: ১৯ লাখ লিটার = ৪৭,৫০০ মণ, পাবনা: ১৫ লাখ লিটার = ৩৭,৫০০ মণ, মোট: ৩৪ লাখ লিটার = ৮৫,০০০ মণ।
এবার ভেবে দেখুন!
শুধুমাত্র সিরাজগঞ্জ ও পাবনায় প্রতিদিন প্রায় ৮৫ হাজার মণ দুধ উৎপাদিত হয়। এই বিশাল প্রবাহের মধ্যে যদি মাত্র ১% ভেজালও ঢুকে পড়ে, তাহলে বছরে ৩ লাখ মণের বেশি ভেজাল দুধ মানুষের খাদ্যচক্রে প্রবেশ করতে পারে।
অনেকের ধারণা, ল্যাকটোমিটারে দুধ পরীক্ষা করলেই ভেজাল ধরা পড়ে। কিন্তু বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, কিছু ভেজাল এমনভাবে করা হয় যাতে নকল দুধের ঘনত্ব কৃত্রিমভাবে সামঞ্জস্য করা যায়। ফলে শুধু একটি সাধারণ পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে শতভাগ বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। এ কারণেই উন্নত ল্যাব পরীক্ষা এবং কঠোর মান নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয়।
দুধ সংগ্রহ ও বিপণনের বিশাল নেটওয়ার্কে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ লিটার দুধ ঢাকাসহ সারাদেশে চলাচল করে। বিশেষ করে দুধের রাজধানীখ্যাত পাবনা, সিরাজগঞ্জ, যশোর, সাতক্ষীরাসহ দেশের বিভিন্ন দুগ্ধ উৎপাদনকারী অঞ্চল থেকে দুধ সংগ্রহ করা হয়। এই বিশাল সরবরাহ ব্যবস্থার কোনো একটি স্তরে ভেজাল প্রবেশ করলে তা হাজার হাজার লিটার দুধের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে একজন ভোক্তা বুঝতেই পারেন না তিনি খাঁটি দুধ কিনছেন, নাকি রাসায়নিক ও ভেজালের মিশ্রণ কিনছেন।
ভেজাল দুধের সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের শিশুরা। একজন মা যখন সন্তানের হাতে এক গ্লাস দুধ তুলে দেন, তখন তিনি বিশ্বাস করেন এটি পুষ্টি, ক্যালসিয়াম ও সুস্বাস্থ্যের উৎস। কিন্তু যদি সেই দুধের মধ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান মিশে থাকে, তাহলে সেটি শুধু খাদ্যে ভেজাল নয়; এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিয়ে নির্মম খেলা। গত এক দশকে কত কোটি লিটার দুধ মানুষের শরীরে প্রবেশ করেছে এবং তার কতটুকু সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ ছিল, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।
যে দুধ গাভীর কাছ থেকে আসে না, অথচ দুধের দামে বিক্রি হয়, সেটি শুধু ভেজাল নয়; সেটি শিশুদের পুষ্টি, খামারিদের অধিকার এবং জনস্বাস্থ্যের বিরুদ্ধে একটি নীরব অপরাধ।
তথ্যসূত্র: প্রাকৃতিক হাট
