
সরকারি প্রতিষ্ঠান জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের পরীক্ষাগারের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া খাদ্যপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভেজাল পাওয়া গেছে মিষ্টি জাতীয় খাদ্যে। প্রতিষ্ঠানটির ২০২২ সালের নমুনা পরীক্ষার প্রতিবেদনে দেখা যায়, চমচম, রসগোল্লা, কালোজামসহ বিভিন্ন ধরনের মিষ্টির ৭৫ শতাংশ নমুনায় মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর উপাদান শনাক্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকদের মতে, এসব ভেজাল খাদ্য দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিলতাসহ নানা রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন বাজার ও দোকান থেকে খাদ্যপণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ করে। ২০২২ সালে সারা দেশ থেকে ১ হাজার ৫১১টি নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে ১ হাজার ১৩৩টি নমুনা পরীক্ষা করা হয়। প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে মিষ্টিতে ভেজালের হার ৫০ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৫ শতাংশে পৌঁছেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভেজালের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ঘি, যেখানে ভেজালের হার ৬৬ শতাংশ। ২০২১ সালে ঘিতে এই হার ছিল ৫০ শতাংশ। এরপর রয়েছে গুঁড়া হলুদ (৩৩.৭৩ শতাংশ), গুড় (৩৩.৩৩ শতাংশ) এবং বেসন (২৫ শতাংশ)। এছাড়া গুঁড়া মরিচে ভেজালের হার ১৬.৯৮ শতাংশ, নারিকেল তেল ও অলিভ অয়েলে ১১.৬০ শতাংশ, লবণে ১০.৫০ শতাংশ, আটা, গম ও ভুট্টায় ৫.৫৬ শতাংশ, ধনিয়ায় ৫.৪১ শতাংশ, সয়াবিন তেলে ৩.৮৫ শতাংশ, সরিষার তেলে ২.৯৯ শতাংশ এবং ডাল ও ছোলায় ২.৩৮ শতাংশ ভেজাল পাওয়া গেছে। তবে পরীক্ষায় চালে কোনো ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া যায়নি।
প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, শুধু মিষ্টি নয়, দই, ঘি, গুড়, মধু, গম, আটা, ডাল, লবণ, সয়াবিন তেল, হলুদ, মরিচসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বহু খাদ্যপণ্যেও ভেজাল পাওয়া গেছে। এমনকি শিশুখাদ্য গুঁড়া দুধেও বিভিন্ন ধরনের ক্ষতিকর রাসায়নিক ব্যবহারের তথ্য উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অসাধু ব্যবসায়ীরা খাদ্যে টেক্সটাইল কেমিক্যাল, টেক্সটাইল রং, ইউরিয়া, হাইড্রোজ, কার্বাইড, ফরমালিন ও প্যারাথিয়নের মতো ক্ষতিকর উপাদান মিশিয়ে থাকে। বেকারি পণ্যে নিম্নমানের আটা, পচা ডালডা, নিম্নমানের তেল ও ডিম ব্যবহার করা হয়। মসলায় কাপড়ের বিষাক্ত রং, ধানের তুষ, ইট ও কাঠের গুঁড়া, নিম্নমানের সুজি ও মোটর ডাল মেশানোর অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে দুধ দীর্ঘ সময় সংরক্ষণ করতে ফরমালিন ব্যবহার করা হয়। এছাড়া ছানার ফেলনা পানি, ময়লাযুক্ত পানি, থাইসোডা, পার-অক্সাইড, ময়দা, ভাতের মাড় ও চিনি ব্যবহার করে নকল দুধ তৈরির ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ব ম ফারুক গণমাধ্যমকে বলেন, টেক্সটাইল রং ও বিভিন্ন রাসায়নিক মানবদেহে প্রবেশের পর প্রায় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গের ক্ষতি করতে পারে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় লিভার, কিডনি, হৃৎপিণ্ড ও অস্থিমজ্জা। শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে এসব অঙ্গ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি বিকল হওয়া এবং হাঁপানিসহ নানা জটিল রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়।
তিনি আরও বলেন, রাসায়নিকযুক্ত খাদ্য গ্রহণের ফলে পেটব্যথা, বমি, মাথা ঘোরা, পাতলা পায়খানা, বদহজম, অতিরিক্ত ঘাম, শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়া এবং হঠাৎ পালস রেট কমে বা বেড়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মো. মোরশেদ আলম বলেন, বিভিন্ন ধাতুভিত্তিক ভেজাল খাদ্য কিডনিকে আংশিক থেকে সম্পূর্ণ বিকল করে দিতে পারে। তাঁর মতে, দেশে কিডনি রোগী বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ভেজাল খাদ্য, বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে কিডনি রোগ বাড়ার পেছনেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। এছাড়া ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে অ্যালার্জি, অ্যাজমা, চর্মরোগ, বমি, মাথাব্যথা, অরুচি, উচ্চ রক্তচাপ, হার্ট অ্যাটাক, লিভার সিরোসিসসহ বিভিন্ন জটিল রোগের ঝুঁকি বাড়ছে।
নোট: সংবাদটি ২০২২ সালে বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত
