
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) বিভিন্ন আবাসিক হলের ক্যান্টিনে খাবারের মান নিয়ে ধারাবাহিক অভিযোগে শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপদ খাবার নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন হলে পরিবেশিত খাবারে ব্লেড, কেঁচো, তেলাপোকা, জোঁক ও অন্যান্য পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
প্রতিটি ঘটনার পর তদন্ত, জরিমানা ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হলেও নতুন অভিযোগ সামনে আসছে। ফলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্ন— হল ক্যান্টিনে নিরাপদ খাবার নিশ্চিত হবে কবে? বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো আবাসিক শিক্ষার্থীর দৈনন্দিন খাবারের প্রধান ভরসা হল ক্যান্টিন। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সেই আস্থাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। সামাজিক মাধ্যমেও বিষয়টি নিয়ে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে।
গত ৫ জুলাই শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রধান ক্যান্টিনের তরকারিতে ধারালো ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ করেন এক শিক্ষার্থী। অভিযোগের পর হল সংসদ সংশ্লিষ্ট ক্যান্টিন তালাবদ্ধ করে। পরে ১৬ জুলাই জসীমউদ্দীন হলের ক্যান্টিনের খাবারেও ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় হল প্রশাসন ক্যান্টিন পরিচালনাকারীকে জরিমানা করে এবং ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে সতর্ক করে। এর আগে একই হলের ক্যান্টিনের খাবারে জোঁক পাওয়ার অভিযোগও ওঠে।
গত ২০ জুলাই বিজয় একাত্তর হলের ক্যান্টিনের খাবারে পোকা পাওয়ার অভিযোগ আসে। ২১ জুলাই শেখ মুজিবুর রহমান হলের ক্যান্টিনে পরিবেশিত ইলিশ মাছে কেঁচো পাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের খাবারে তেলাপোকা পাওয়ার অভিযোগ করেন শিক্ষার্থীরা।
এর আগেও বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল ক্যান্টিনের খাবারে সিগারেটের ফিল্টার, রাবার ব্যান্ড, ১০ টাকার নোট, কাঁকড়াসহ বিভিন্ন পোকামাকড় পাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। শিক্ষার্থীদের দাবি, এসব বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিন ধরে নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার পরিবেশন এবং কার্যকর তদারকির অভাবের কারণেই এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
ঢাবির শিক্ষার্থী রাফি হাওলাদার বলেন, আগে তিনি জসীমউদ্দীন হলের ক্যান্টিনে খেতেন। খাবারে ব্লেড পাওয়ার ঘটনার পর সেখানে খাওয়া বন্ধ করে অন্য ক্যান্টিনে যেতে শুরু করেন। কিন্তু সেখানেও কখনও পোকা, কখনও কেঁচো পাওয়ার অভিযোগ এসেছে। তার ভাষায়, ‘আমরা আসলে কোথায় খাব? প্রতিদিন যদি এমন ঘটনা ঘটতেই থাকে, তাহলে নিরাপদ খাবারের জন্য শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবে?’
বিজয় একাত্তর হলের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আবীর আহম্মেদও ক্যান্টিনের খাবার খেয়ে অসুস্থ হওয়ার দাবি করেছেন। তার অভিযোগ, চিকেন চাপ খাওয়ার পরদিন থেকেই তীব্র পেটব্যথা, জ্বর ও ফুড পয়জনিংয়ের উপসর্গ দেখা দেয় এবং কয়েক দিন স্যালাইন নিতে হয়। একই সঙ্গে তিনি শহীদুল্লাহ হলের ক্যান্টিনের খাবারে মাছি পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্যবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক আবিরা নাওয়ার বলেন, নিরাপদ খাবার পাওয়া প্রত্যেক শিক্ষার্থীর মৌলিক অধিকার। শুধু হল প্রশাসনের সচেতনতা নয়, পুরো ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি বলেন, ভালো মানের কাঁচামাল সংগ্রহ, প্যাকেটজাত তেল ও আয়োডিনযুক্ত লবণের ব্যবহার, রান্নাঘরের স্বাস্থ্যবিধি এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করা জরুরি। মাছ, মাংস ও শাকসবজি একসঙ্গে সংরক্ষণ করলে ক্রস-কন্টামিনেশনের ঝুঁকি তৈরি হয়। তাই আলাদা সংরক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং নিয়মিত মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ডাইনিং কমিটিতে শিক্ষক প্রতিনিধির পাশাপাশি শিক্ষার্থী প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত করলে জবাবদিহিতা বাড়বে। পাশাপাশি শাকসবজি, ফল, দুধ ও ডিমসহ স্বাস্থ্যকর খাবারের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করারও পরামর্শ দেন তিনি।
শহীদ সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. নুরুল আমিন বলেন, এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ইতোমধ্যে সতর্ক করা হয়েছে। তার মতে, বারবার ব্যবস্থাপনা পরিবর্তন হলে খাবারের মান ধরে রাখা কঠিন হয়। তিনি জানান, দায়িত্ব নেওয়ার আগে গত এক বছরে এ পদে তিন থেকে চারবার পরিবর্তন হয়েছে, যা সেবার ধারাবাহিকতায় প্রভাব ফেলেছে। তিনি বলেন, খাবারের মান নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, প্রতিটি অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ব্লেড পাওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ক্যান্টিন পরিচালনাকারীকে পাঁচ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা ঘটলে আরও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, সব হল প্রশাসনকে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয়েছে। শিক্ষার্থীদের খাবারের গুণগত মান নিশ্চিত করা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্ব এবং অভিযোগ পেলেই তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
সূত্র: প্রতিদিনের বাংলাদেশ
