আপেলের গায়ে লুকানো ১০৬ টাকার ট্যাক্স

বাংলাদেশে আপেল কোনো দেশীয় উৎপাদনভিত্তিক ফল নয়। স্বাধীনতার পর থেকেই দেশের বাজারে আপেলের শতভাগ চাহিদা পূরণ করতে হচ্ছে আমদানির মাধ্যমে। সময়ের পরিক্রমায় ফলের বাজারে আপেলের অবস্থান, আমদানির উৎস এবং বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঘটেছে বড় ধরনের পরিবর্তন।

স্বাধীনতার পর আশির দশক পর্যন্ত বাংলাদেশে আপেলকে মূলত বিলাসদ্রব্য কিংবা অসুস্থ রোগীদের উপহার হিসেবে দেখা হতো। সে সময় প্রতিবেশী দেশ ভারত (হিমাচল ও কাশ্মীর) এবং পাকিস্তান থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সীমিত পরিসরে আপেল আমদানি করা হতো।

তবে ২০০০-এর দশক থেকে চিত্র বদলাতে শুরু করে। মানুষের অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং হিমাগার (কোল্ড চেইন) ব্যবস্থার উন্নতির ফলে আপেলের আমদানি ও সরবরাহ জ্যামিতিক হারে বাড়ে। এক সময়ের আভিজাত্যের স্মারক এই ফলটি ধীরে ধীরে সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় নিয়মিত স্থান করে নেয়।

বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম প্রধান আপেল উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে সমুদ্র ও স্থলপথে বাংলাদেশে আপেল আসছে। আমদানিকৃত এই ফলের সবচেয়ে বড় অংশ সরবরাহ করে চীন। এছাড়া দক্ষিণ আফ্রিকা (বিশেষ করে গালা, রয়্যাল গালা ও গ্র্যানি স্মিথ জাত), ভারত, ব্রাজিল, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকেও বিপুল পরিমাণ আপেল আমদানি হয়।

মার্কিন কৃষি বিভাগের (USDA) ২০১৯-২০২০ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, বছরে প্রায় ২ লাখ ৭১ হাজার টন আপেল আমদানি করে রাশিয়া ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের পরেই বিশ্বে ৩য় শীর্ষ আপেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে উঠে আসে বাংলাদেশ। বর্তমানে প্রতি বছর ১৬ কোটি কেজিরও (১.৬ লাখ টন) বেশি আপেল বাংলাদেশে আনা হয়, যার বাজারমূল্য শত শত কোটি টাকা।

বাংলাদেশের মানুষ কর দেয় না—কথাটি বহুল প্রচলিত হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের মানুষ প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ধরনের কর দিচ্ছে, যার বড় একটি অংশই তারা অজান্তে পরিশোধ করছে। আমদানি করা পণ্য খালাসের সময় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে শুল্ক ও কর আদায় করে সরকার। পরে সেই করের বোঝা পণ্যের দামের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ে ভোক্তার ওপর। ফলে পণ্য কেনার সময় বাড়তি দাম পরিশোধ করতে হয় ক্রেতাকে।

আমদানি করা পণ্যের ক্ষেত্রে করের এই বোঝা কতটা বেশি, তার একটি উদাহরণ হতে পারে আপেল। প্রতি কেজি ৮৮ টাকা দামে আমদানি করা আপেলের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীকে পাঁচ ধরনের শুল্ক ও কর মিলিয়ে দিতে হচ্ছে ১০৬ টাকা। ফলে কাস্টম হাউজ থেকে পণ্য খালাসের সময় করসহ প্রতি কেজি আপেলের দাম দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১৯৪ টাকা। অর্থাৎ মূল আমদানি মূল্যের তুলনায় করের পরিমাণই বেশি।

কাস্টম হাউজ সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার একটি কোম্পানি প্রতি কেজি ৭০ সেন্ট মূল্য ঘোষণা দিয়ে চীন থেকে ২৩ হাজার ৭২০ কেজি আপেল আমদানি করেছে। এর জন্য আমদানি মূল্য ছিল ২০ লাখ ৬৯ হাজার ৯০৮ টাকা। বিপরীতে এসব আপেলের জন্য মোট ২৫ লাখ ২৪ হাজার ৫৭০ টাকা কর দিতে হয়েছে। অর্থাৎ প্রতি কেজি আপেলের বিপরীতে কর দিতে হয়েছে প্রায় ১০৬ টাকা। করসহ প্রতি কেজি আপেলের দাম পড়েছে ১৯৪ টাকা। কর বাদ দিলে প্রতি কেজির আমদানি মূল্য ছিল ৮৮ টাকা।

একইভাবে ঢাকার আরেকটি কোম্পানি দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে প্রতি কেজি ৭০ সেন্ট মূল্য ঘোষণা দিয়ে ২১ হাজার ১৬৮ কেজি আপেল আমদানি করেছে। এর আমদানি মূল্য ছিল ১৮ লাখ ৪৩ হাজার ৭৮০ টাকা। এসব আপেলের বিপরীতে মোট ২২ লাখ ৪৮ হাজার ৯৬৩ টাকা কর দিতে হয়েছে। প্রতি কেজিতে করের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ১০৬ টাকা। করসহ প্রতি কেজির দাম পড়েছে ১৯৩ টাকা। আর কর বাদে আমদানি মূল্য ছিল ৮৭ টাকা।

আপেল আমদানির ক্ষেত্রে শুল্কায়নযোগ্য মূল্য বা অ্যাসেসেবল ভ্যালুর (এভি) ওপর মোট পাঁচ ধরনের শুল্ক ও কর পরিশোধ করতে হয়। এগুলোর সম্মিলিত হার ১২১ দশমিক ৭৮ শতাংশ। এর মধ্যে কাস্টমস ডিউটি বা শুল্ক ২৫ শতাংশ, রেগুলেটরি ডিউটি বা নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক ২০ শতাংশ, সাপ্লিমেন্টারি ডিউটি বা সম্পূরক শুল্ক ৩০ শতাংশ, ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স বা ভ্যাট ১৫ শতাংশ এবং অ্যাডভান্স ইনকাম ট্যাক্স বা অগ্রিম আয়কর ৫ শতাংশ।

চলতি বাজেটে আপেলের ওপর সম্পূরক শুল্ক ১০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। একই সঙ্গে ৫ শতাংশ অ্যাডভান্স ট্যাক্স বাতিল করা হয়েছে। এটি ভ্যাট বিভাগের রাজস্ব হলেও এতদিন কাস্টম হাউজের মাধ্যমে আদায় করা হতো। তবে ব্যবসার আয় হওয়ার আগেই আদায় করা ৫ শতাংশ অগ্রিম আয়কর বহাল রয়েছে।

এ ছাড়া আপেল আমদানির ক্ষেত্রে প্রতি কেজির জন্য সর্বনিম্ন ৭০ সেন্ট মূল্য ঘোষণা নির্ধারিত রয়েছে। ফলে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক ও করের কারণে আপেলের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পরে পরিবহন, সংরক্ষণ, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের বিভিন্ন ব্যয় ও মুনাফা যুক্ত হয়ে ভোক্তার কাছে আরও বেশি দামে পৌঁছে পণ্যটি।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ