
বাংলাদেশে ভোজ্যতেল একটি অন্যতম প্রধান নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য। রান্নাবান্নার দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে এই পণ্যের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত বেশি হলেও, চাহিদার সিংহভাগই মেটাতে হয় বৈদেশিক আমদানির মাধ্যমে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের দরপতন বা দরবৃদ্ধি, বিশ্বরাজনীতি এবং বৈদেশিক মুদ্রার হারের ওপর দেশের ভোজ্যতেলের বাজার বহুলাংশে নির্ভরশীল।
প্রতিদিন সকালে রান্নাবান্নার হাঁড়ি চড়তেই যে উপাদানটির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি পড়ে, তা হলো ভোজ্যতেল। বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় তেলের ব্যবহার অপরিহার্য। তবে চাহিদার তুলনায় স্থানীয় উৎপাদন সামান্য হওয়ায় দেশের ভোজ্যতেলের বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর।
বাংলাদেশে বছরে ভোজ্যতেলের চাহিদা প্রায় ২৪ থেকে ৩২ লাখ মেট্রিক টন। এ হিসাবে বার্ষিক ব্যবহার প্রায় ২৬ থেকে ৩৫ কোটি লিটারের বেশি। দৈনিক গড়ে ভোজ্যতেলের ব্যবহার প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ লিটার।
এর মধ্যে দেশে সর্ষে, তিল, সূর্যমুখী ও চীনাবাদাম থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১০ শতাংশ ভোজ্যতেল উৎপাদিত হয়। বাকি প্রায় ৯০ শতাংশ চাহিদা পূরণে বাংলাদেশকে আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।
বাংলাদেশে যেসব ভোজ্যতেল আমদানি করা হয়, তার মধ্যে শীর্ষে রয়েছে পাম অয়েল (মোট আমদানির প্রায় ৬০-৬৫%) এবং সোয়াবিন তেল (প্রায় ৩০-৩৫%)। এছাড়া সীমিত পরিমাণে সূর্যমুখী ও সরিষার তেল আমদানি হয়।
ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া থেকে প্রধানত অপরিশোধিত (Crude) পাম অয়েল আমদানি করা হয়। আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল ও প্যারাগুয়ে থেকে সোয়াবিন বীজ ও অপরিশোধিত সোয়াবিন তেল আনা হয়।
আমদানিনির্ভরতার কারণে বিশ্ববাজারের সামান্য পরিবর্তনও দেশের পাইকারি ও খুচরা বাজারে বড় প্রভাব ফেলে। প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ ভোজ্যতেল আমদানিতে কয়েক বিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়, যা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করে।
রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, লোহিত সাগরের নৌ-সংকট কিংবা উৎপাদনকারী দেশগুলোর (যেমন ইন্দোনেশিয়ার পাম অয়েল রফতানি নিষেধাজ্ঞা) নীতিগত পরিবর্তনের ধাক্কা সরাসরি বাংলাদেশের বাজারে এসে পড়ে।
বাংলাদেশে প্রক্রিয়াজাত খাদ্য শিল্প, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং বাসা-বাড়িতে ভোজ্যতেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে।
বাজারে এখনো ড্রামজাত বা খোলা তেলের আধিপত্য বেশি, বিশেষ করে পাম অয়েলের ক্ষেত্রে। তবে ভেজাল রোধ ও পুষ্টিমান বজায় রাখতে সরকার ধাপে ধাপে খোলা তেল বিক্রি বন্ধ করে শতভাগ প্যাকড বা বোতলজাত তেল বিক্রির নীতি বাস্তবায়নের চেষ্টা করছে।
চিকিৎসকদের মতে, বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে তেলের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার হ্রদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ ও স্থূলতার অন্যতম বড় কারণ। এছাড়া অতিরিক্ত উত্তাপে পুনঃব্যবহৃত তেল ব্যবহারে ক্যানসারের মতো দূরারোগ্য ব্যাধির ঝুঁকি বাড়ে।
ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক অস্থিতিশীলতা থেকে দেশকে রক্ষা করতে সরকার ও কৃষি গবেষকরা দেশীয় তেলের উৎপাদন বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছেন।
কম মেয়াদি ও উচ্চ ফলনশীল সরিষার জাত (যেমন- বারি সরিষা-১৪, ১৭ ও ১৮) উদ্ভাবনের ফলে আমন ও বোরো ধানের মধ্যবর্তী সময়ে খালি জমিতে সরিষা চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। দেশে রাইস ব্রান অয়েল ও সূর্যমুখী তেলের উৎপাদন সম্ভাবনা বাড়ছে। ধানের কুঁড়া থেকে প্রস্তুতকৃত তেল পুষ্টিগুণে সমৃদ্ধ হওয়ায় এবং দেশে ধানের পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকায় স্থানীয়ভাবে এই খাতের বিকাশে জোর দেওয়া হচ্ছে।
ভোজ্যতেলে শতভাগ স্বাবলম্বী হওয়া রাতারাতি সম্ভব নয়। তবে পরিকল্পিতভাবে স্থানীয় সরিষা ও রাইস ব্রান অয়েলের উৎপাদন বাড়ানো গেলে আমদানির ওপর নির্ভরতা যেমন অন্তত ৩০-৪০ শতাংশ কমানো সম্ভব, তেমনি বেঁচে যাবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। একই সাথে পরিমিত ও স্বাস্থ্যকর ভোজ্যতেল ব্যবহারে ভোক্তাদের মাঝে সচেতনতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।
