খাবারে ভেজালের শুরু কবে, জানে না কেউ, তবে ইতিহাসটা পুরোনো

খাদ্যে ভেজাল বাংলাদেশে এটি যেন নতুন কোনো শব্দ নয়। বাজারে মাছ, মাংস, দুধ, মসলা, তেল, মিষ্টি কিংবা ফলমূল, কোনো কিছু কিনতে গেলেই ভোক্তার মনে প্রশ্ন জাগে, খাবারটি আসলেই নিরাপদ তো? কিন্তু প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল দেওয়া শুরু হয়েছিল কবে?

এর সুনির্দিষ্ট কোনো সাল বা নির্দিষ্ট ঘটনাকে খাদ্যে ভেজালের ‘শুরু’ হিসেবে চিহ্নিত করার মতো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস নেই। তবে বিভিন্ন গবেষণা, সরকারি পরীক্ষার তথ্য ও নথিপত্র বলছে, বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল বহু দশকের পুরোনো সমস্যা। স্বাধীনতা পরবর্তী সময়েই এটি জনস্বাস্থ্য ও খাদ্যনিরাপত্তার আলোচনায় জায়গা করে নেয়। আর ১৯৯০-এর দশক থেকে খাদ্যে ভেজালের ব্যাপকতা নিয়ে তুলনামূলকভাবে স্পষ্ট গবেষণাভিত্তিক তথ্য পাওয়া যায়।

১৯৯৫ থেকে ২০১১: ভয়াবহ চিত্র

বাংলাদেশের খাদ্যে ভেজালের মাত্রা নিয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গবেষণাগুলোর একটি হলো ঢাকায় ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত খাদ্যে ভেজাল নিয়ে পরিচালিত গবেষণা। গবেষণায় ঢাকা সিটি করপোরেশনের পাবলিক হেলথ ফুড ল্যাবরেটরি, বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উৎসের খাদ্য পরীক্ষার তথ্য পর্যালোচনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৯৫ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে ঢাকায় প্রতিদিন খাওয়া খাদ্যের প্রায় ৪০ থেকে ৫৪ শতাংশ ভেজালযুক্ত ছিল। একই গবেষণায় ৩৫টিরও বেশি খাদ্যপণ্যে ভেজালের তথ্য পাওয়া যায়।

অর্থাৎ এটি বিচ্ছিন্ন কয়েকটি অসাধু ব্যবসায়ীর কর্মকাণ্ড ছিল না; বরং খাদ্যশৃঙ্খলের বিভিন্ন পর্যায়ে ভেজালের বিস্তার তখনই যথেষ্ট বড় আকার ধারণ করেছিল।

২০০১–২০০৫: কিছুটা কমলেও সমস্যা যায়নি

গবেষণায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উঠে এসেছে। ২০০১ থেকে ২০০৫ সালের মধ্যে ঢাকায় পরীক্ষিত খাদ্য নমুনায় ভেজালের হার পরিসংখ্যানগতভাবে কমেছিল। কিন্তু সেই উন্নতি সমস্যাটিকে নির্মূল করতে পারেনি। কারণ ১৯৯৫–২০১১ পুরো সময়কাল বিবেচনায় নিলে ভেজালের মাত্রা ৪০–৫৪ শতাংশের মধ্যেই ছিল।

গবেষকদের পর্যবেক্ষণ ছিল, খাদ্যে ভেজালের ব্যাপ্তি এতটাই বেশি যে সরকার, ব্যবসায়ী এবং ভোক্তা—তিন পক্ষেরই সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

ভেজাল শুধু এক ধরনের খাবারে সীমাবদ্ধ ছিল না

গবেষণার সময়কালে দুধ, মিষ্টি, মসলা, তেল, লবণসহ বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্যে মানহীনতা ও ভেজালের তথ্য পাওয়া যায়। এমনকি ২০০৫ সালে বিএসটিআইয়ের পরীক্ষায় ৬২টি লবণের ব্র্যান্ডের মধ্যে ৫৪টি নির্ধারিত মান পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।

গবেষণায় মিষ্টির ক্ষেত্রেও উদ্বেগজনক তথ্য উঠে আসে। জনপ্রিয় রসগোল্লার নমুনায় ধারাবাহিকভাবে ভেজাল শনাক্ত হওয়ার কথা গবেষণাটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

তাহলে কি ১৯৯৫ সালেই ভেজালের শুরু?

না। ১৯৯৫ সালকে বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজালের শুরুর বছর বলা যাবে না।

১৯৯৫–২০১১ সালের গবেষণাটি মূলত ওই সময়ের বিদ্যমান পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। ফলে এর আগে ভেজাল ছিল না- এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখান থেকে পাওয়া যায় না। বরং বলা যায়, ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে খাদ্য ভেজালের ব্যাপকতা সম্পর্কে গবেষণাভিত্তিক তথ্য আমাদের হাতে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।

এই পার্থক্যটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ‘ভেজাল শুরু হয়েছিল’ এবং ‘ভেজালের ব্যাপকতার প্রমাণ পাওয়া যায়’ দুটি বিষয় এক নয়।

কেন বাড়ল ভেজাল?

খাদ্যে ভেজালের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখা যায় অতিরিক্ত মুনাফার প্রবণতা। কম দামে নিম্নমানের উপাদান ব্যবহার, পণ্যের ওজন বা পরিমাণ বাড়ানো, দ্রুত পচনশীল খাদ্য সংরক্ষণ এবং দেখতে আকর্ষণীয় করার জন্য ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহারের মতো প্রবণতা ধীরে ধীরে বাজারে জায়গা করে নেয়।

এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার দীর্ঘ ও জটিল শৃঙ্খল, পর্যাপ্ত মান নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি, পরীক্ষাগারের সীমাবদ্ধতা এবং অনেক ক্ষেত্রে ভোক্তার অসচেতনতা।

ফলে ভেজাল শুধু উৎপাদন পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির বিভিন্ন পর্যায়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

আইন ছিল, কিন্তু সমস্যা থামেনি

খাদ্যে ভেজাল নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশের আইনগত কাঠামোও একেবারে নতুন নয়। খাদ্যে ভেজাল বা ক্ষতিকর খাদ্য বিক্রির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির পুরোনো বিধানসহ বিভিন্ন সময়ে আইন করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এবং খাদ্যনিরাপত্তা-সংক্রান্ত পৃথক কাঠামো তৈরি হয়েছে।

অর্থাৎ সমস্যা মোকাবিলায় আইন ও প্রতিষ্ঠান তৈরি হলেও বাস্তবে বাজার থেকে ভেজাল পুরোপুরি নির্মূল করা যায়নি।

ভেজালের ধরনও বদলেছে

আগের দিনের ভেজাল বলতে যেখানে সাধারণত পণ্যের সঙ্গে নিম্নমানের বা সস্তা উপাদান মেশানো বোঝানো হতো, সময়ের সঙ্গে এর ধরন আরও জটিল হয়েছে।

বর্তমানে ভেজালের পাশাপাশি সামনে এসেছে—

# কৃত্রিম রং ও রাসায়নিকের ব্যবহার;

# ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী উপাদান;

# নিম্নমানের কাঁচামাল;

# নকল বা ভুয়া ব্র্যান্ড;

# মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য নতুন মোড়কে বাজারজাত;

# খাদ্যের নাম ও পরিচয় পরিবর্তন;

# ওজনে কারচুপি;

# অনুমোদনহীন ও মানহীন প্রক্রিয়াজাত খাদ্য।

অর্থাৎ ভেজাল এখন শুধু ‘একটি খাবারের সঙ্গে আরেকটি উপাদান মেশানো’র মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি খাদ্যব্যবস্থার একটি বহুমাত্রিক প্রতারণায় পরিণত হয়েছে।

ভেজাল মানেই জনস্বাস্থ্যে আঘাত

খাদ্যে ভেজালের ইতিহাস শুধু অসাধু ব্যবসায়ীদের ইতিহাস নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানুষের স্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, বাজার ব্যবস্থাপনা এবং রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।

১৯৯৫–২০১১ সালের গবেষণায় প্রতিদিনের খাদ্যের ৪০–৫৪ শতাংশে ভেজালের যে চিত্র উঠে এসেছিল, তা দেখায় সমস্যাটি কতটা গভীরে ছিল।

তবে এটিকে বর্তমান বাংলাদেশের খাদ্যের নির্দিষ্ট ভেজালের হার হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। কারণ এটি নির্দিষ্ট সময়ের ঢাকা শহরকেন্দ্রিক তথ্য এবং গবেষণায় ব্যবহৃত নমুনা ও পরীক্ষার সীমাবদ্ধতাও ছিল।

বাংলাদেশে খাদ্যে ভেজাল ঠিক কোন দিন বা কোন বছর থেকে শুরু হয়েছে, তার উত্তর ইতিহাসে নেই। কিন্তু এটুকু স্পষ্ট যে স্বাধীনতার পর বহু দশক ধরে এটি একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে টিকে আছে এবং অন্তত ১৯৯০-এর দশক থেকে এর ব্যাপকতার শক্তিশালী গবেষণাভিত্তিক প্রমাণ পাওয়া যায়।

তাই খাদ্যে ভেজালের ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো- সমস্যাটি নতুন নয়, কিন্তু ভেজালের ধরন ও কৌশল সময়ের সঙ্গে বদলেছে।

একসময় প্রশ্ন ছিল, খাবারে কী মেশানো হয়েছে। এখন প্রশ্ন আরও বড়- খাবারটি আদৌ আসল কি না, নিরাপদ কি না এবং উৎপাদন থেকে ভোক্তার প্লেট পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি কতটা নিয়ন্ত্রিত।

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার লড়াইকে আরও কঠোর, বিজ্ঞানভিত্তিক ও দীর্ঘমেয়াদি করতে হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ