প্রাণিজ খাদ্যে ক্ষতিকর উপাদান, দুই মাসের সময় বেঁধে দিল সরকার

মাছ, মুরগি ও গবাদিপশুর খাবারে (ফিড) ক্ষতিকর উপাদান ও অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এবার ফিড উৎপাদনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। সরকারি গাইডলাইনের বাইরে ফিড উৎপাদন বন্ধে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ দুই মাস সময় দেওয়া হয়েছে। এ সময়সীমা শেষ হলে ফিড মিল, বাজার ও বিক্রয়কেন্দ্রে অভিযান চালিয়ে নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা করা হবে। অনিয়ম ধরা পড়লে পশুখাদ্য আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী নেওয়া হবে আইনগত ব্যবস্থা।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানান। তিনি বলেন, শুধু মাছ, মুরগি বা গবাদিপশুর উৎপাদন বাড়ানোই সরকারের লক্ষ্য নয়; মানুষের জন্য নিরাপদ প্রাণিজ খাদ্য নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে সরকারি নির্দেশনার বাইরে কোনোভাবেই ফিড উৎপাদন করতে দেওয়া হবে না। সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকুও উপস্থিত ছিলেন।

জনস্বাস্থ্যে বাড়ছে উদ্বেগ

ফিডে সিসা, ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, আফলাটক্সিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের মতো ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন গবেষণার তথ্য সামনে এসেছে। বিষয়টি এখন শুধু প্রাণিসম্পদ খাতের নয়, জনস্বাস্থ্যেরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পশুখাদ্যে থাকা ক্ষতিকর উপাদান প্রাণীর শরীরে জমা হতে পারে। পরে মাংস, দুধ, ডিম ও মাছের মাধ্যমে এসব উপাদান মানুষের খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশের ঝুঁকি রয়েছে। পাশাপাশি ফিডে অ্যান্টিবায়োটিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআরের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ঢাকা ও সাতক্ষীরা থেকে সংগ্রহ করা মাছ ও চিংড়ির ৪৮টি ফিডের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এসব নমুনায় বিভিন্ন মাত্রায় আফলাটক্সিন, সিসা, ক্যাডমিয়াম ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর আগে পোলট্রি ফিড নিয়েও একাধিক গবেষণায় অ্যান্টিবায়োটিকের অবশিষ্টাংশ ও ভারী ধাতুর উপস্থিতির তথ্য উঠে এসেছে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব উপাদানের ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে কোন উপাদান কত পরিমাণে এবং কত দীর্ঘ সময় শরীরে প্রবেশ করছে তার ওপর। তাই নিয়মিত বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা, ক্ষতিকর উপাদানের উৎস শনাক্ত করা এবং কার্যকর নজরদারির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তাঁরা।

‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ’ নিয়ে উদ্যোক্তাদের আপত্তি

সরকারের কঠোর অবস্থানের মধ্যেই বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) পরিচালিত সাম্প্রতিক অভিযান নিয়ে ফিড শিল্পের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

উদ্যোক্তাদের দাবি, পশুখাদ্য উৎপাদন, নিবন্ধন, মান নিয়ন্ত্রণ, নমুনা সংগ্রহ এবং আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে পশুখাদ্য আইন-২০১০ ও পশুখাদ্য বিধিমালা-২০১৩ অনুযায়ী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর ও মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট দায়িত্ব রয়েছে। একই বিষয়ে একাধিক সংস্থার অভিযান শিল্পে ‘দ্বৈত নিয়ন্ত্রণ’ তৈরি করছে।

তবে সরকারের অবস্থান হলো, শিল্পের স্বার্থের পাশাপাশি খাদ্যের মান ও জনস্বাস্থ্য সুরক্ষাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, শিল্পের স্বার্থ সংরক্ষণ করা হবে। তবে নিম্নমানের বা ভেজাল পশুখাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না। প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উৎপাদন বাড়লেও নিরাপদ ফিড বড় চ্যালেঞ্জ

জাতীয় মৎস্য পক্ষ-২০২৬ উপলক্ষে সরকার যখন দেশে মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য তুলে ধরছে, তখন নিরাপদ মাছ উৎপাদনের বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে। আগামী ১৬ আগস্ট থেকে শুরু হচ্ছে জাতীয় মৎস্য পক্ষ। এবারের প্রতিপাদ্য—‘রূপালি মৎস্য স্বনির্ভর দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’।

সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২০২৫ অর্থবছরে দেশে মাছ উৎপাদন হয়েছে ৫১ দশমিক ১১ লাখ মেট্রিক টন। একই সময়ে মাথাপিছু দৈনিক মাছের প্রাপ্যতা দাঁড়িয়েছে ৬৭ দশমিক ৮০ গ্রাম।

ফলে শুধু মাছের উৎপাদন বাড়ানো নয়, উৎপাদনে ব্যবহৃত ফিডের মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও এখন বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ ফিড নিরাপদ না হলে মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের নিরাপত্তাও প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।

এই পরিস্থিতিতে সরকারি গাইডলাইনের বাইরে ফিড উৎপাদন বন্ধে দেওয়া দুই মাসের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর মাঠপর্যায়ে কঠোর অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নিয়মিত পরীক্ষা ও নজরদারি জোরদার করা গেলে প্রাণিজ খাদ্য উৎপাদনের পুরো শৃঙ্খলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথ আরও শক্তিশালী হবে।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ