‘বিজয়’ বা ‘মুক্তি’ কেন বিষের নাম: পাভেল পার্থ

‘রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে, শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে’। জুম-জমিনের সঙ্গে সম্পর্কের সেতুগুলো নানা ভাঙাগড়ার ভেতর দিয়েই রূপান্তরিত হচ্ছে। উদ্বাস্তু হচ্ছে অনেক পেশা, নিখোঁজ হচ্ছে অনেক প্রাণসত্তা। ভাবা যায় যে রাখাল সারা জীবন কৃষিজীবনের জন্য জান উজাড় করেছে, সেই ‘রাখাল’ নামে এখন বাজারে আছে এক বহুজাতিক কীটনাশক। ২০০৬ সালে ২ ফেব্রুয়ারি ভাষার মাসেই ‘ম্যাপ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের’ একটি ধান বালাইনাশককে ‘রাখাল’ নামে অনুমোদন দেওয়া হয় (নিবন্ধন নম্বর-এপি ০৮১৭)। ২০১১ সালে ‘স্মার্ট এগ্রোভেট’ কোম্পানি আরেকটি ধান বালাইনাশকের নাম দেয় ‘কৃষকবন্ধু’। ২০১২ সালে আনন্দ এগ্রোভেট একটি কীটনাশকের নাম দেয় ‘সৈনিক’। রাখাল, সৈনিক বা কৃষকবন্ধু মানে কি রাসায়নিক বিষ? এরা কি প্রাণসত্তাকে হত্যা করে? নিম্নবর্গের ভাষিক অভিধানে উল্লিখিত তিনপক্ষই জানজমানার সুরক্ষা দেয়। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি এদের মানে পাল্টে দিতে চাইছে। সবকিছুতে খুন করে যারা শুধু একক কোনো প্রাণ বাঁচায় তাদেরই নাম আজ রাখাল, সৈনিক বা কৃষক!

বহুজাতিক এই বাণিজ্য বলপ্রয়োগে প্রাণহত্যার মনস্তত্ত্বকে ভাষার শরীর ও রূপকল্পে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে। অস্থির সময়ে তাই সহিংস হয়ে উঠছে চারদিক। সহিংস মানুষ। কারণ রাখাল, সৈনিক কি কৃষক যখন প্রাণহত্যাকারী কীটনাশকের প্রতিরূপ হয়ে দাঁড়ায় সেসব ব্যবহার ও উচ্চারণে তা মনোজগতে ‘সহিংসতার রূপকল্প’ তৈরি করে নেয়। সহিংসতা তখন মনস্তাত্ত্বিকভাবে বৈধ হয়ে যায় শব্দের প্রকরণগত চর্চার ভেতর দিয়ে। পতঙ্গ থেকে মানুষ কি সমাজের ওপরও তাই মানুষ সহিংস হতে বাধ্য হয়। ভাষা তাই শুধু পুস্তকি ভাষা, প্রমিত উচ্চারণ কি শুদ্ধ ব্যাকরণের বিষয় হিসেবে আটকে থাকে না। ভাষার ময়দানে চলমান বাহাদুরি ও সংঘর্ষ, যা ভাষার বিন্যাস ও আবেদনকে নানাভাবে ব্যবহার করে ভাষাচর্চাকারীকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।

মাতৃভাষার সুরক্ষা কি সামগ্রিক ভাষা পরিসর নিয়ে রাষ্ট্রের দৃষ্টিভঙ্গি ও চিন্তাকাঠামো পাল্টে আজ সমাজে লাগাতার চলমান এমনতর সব বাহাদুরি ও মাস্তানি ঠাহর করতে হবে। কারণ ভাষা জাদুঘর বা চিড়িয়াখানায় আটকে রাখার কোনো বিষয় নয়। ভাষা সচল পরিবর্তনশীল এক লড়াকু প্রাণধারা। কিন্তু বহুজাতিক কৃষি কোম্পানির প্রশ্নহীন বাণিজ্য বাহাদুরির কারণে বাংলাদেশে বিশেষত রাষ্ট্রভাষা বাংলার শরীর ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ভাষা পরিসরের সামগ্রিক আলাপে নিদারুণভাবে নিশ্চুপ এদিকটায় নজর দেওয়া জরুরি। কারণ দেশের গ্রামীণ নিম্নবর্গের ভাষিক ময়দান রক্তাক্ত হওয়া মানে বাংলাদেশের ভাষাজগতের এক ব্যাপক ক্ষয় ঘটতে থাকা।

দুর্যোগ নিয়ে বাণিজ্য

ঝড়-তুফানের আখ্যান নিয়েই বাংলাদেশ। এখানকার ভাষাজগৎও তাই সাক্ষ্য দেয়। সমসাময়িককালে ২০০৭ সালের সিডর, ২০০৯ সালের আইলা, মহাসেন, ফণী, বুলবুল ও আম্পানে বিপর্যস্ত হয় দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল। ঘূর্ণিঝড় আইলার ক্ষত নিয়ে এখনো জানবাজি রাখা টিকে থাকার সংগ্রাম করছে সুন্দরবন উপকূল। অন্যায়ভাবে এই ‘আইলাকে’ নিয়ে নির্লজ্জের মতো ব্যবহার করেছে এসিআই ফরমুলেশন লিমিটেড। ২০১০ সালের ২৪ নভেম্বর ‘আইলা’ নামে আমের একটি কীটনাশক নিবন্ধন করে কোম্পানিটি (নম্বর-এপি ১৯৪৩)। আইলা-দুর্গত অঞ্চলের ভাষিক অভিধানে আইলা এক প্রাকৃতিক প্রপঞ্চ। কিন্তু বহুজাতিক কোম্পানি আইলার মানে ও স্মৃতি বদলে দিতে চাইছে। কীটনাশক দিয়ে আমের হপার পোকা দমন করার ভেতর দিয়ে তারা আইলার এক ভিন্ন মানে চালু করতে চাইছে। ঘূর্ণিঝড় আইলা সমষ্টিকে আঘাত করেছে, গাছ কি পতঙ্গ, পাখি কি মানুষ সবাইকে। বহুজাতিক কোম্পানির ‘আইলা বিষ’ কিন্তু শুধু আমের হপার পোকা মেরে আমকে রক্ষা করতে পারে। মানে এখানে সমষ্টি ও একক প্রাণসত্তার ভেতর টিকে থাকার দ্বন্দ্ব তৈরি করছে কোম্পানি। ভাষিক ময়দানের বিকাশমানতার জন্য যেসব শর্ত খুবই গুরুত্ববহ। আইলা-দুর্গত অঞ্চলের জোয়ার-ভাটার ভাষিক গণিতও আজ দখল হয়ে যাচ্ছে। গুড়পুকুর করপোরেশন কোম্পানির চা ও আলুতে ব্যবহৃত একটি কীটনাশকের নাম রাখা হয়েছে ‘জোয়ার’। এভাবেই ‘তীর (গোল্ডেন এগ্রো কেমিক্যালস লিমিটেডের আলুর বালাইনাশক)’ থেকে ‘সীমান্ত’ (কোবরা ল্যান্ডকেয়ার কোম্পানির আলুর কীটনাশক) সবই আজ বহুজাতিক বিষের বোতলে বন্দি!

মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়

ভাষা জান কি জবান পায় চারপাশের বিস্তার ও কারিগরি থেকেই। চারপাশই যদি বদলে যায়, জবরদস্তি করে বদলে দেওয়া হয় তখন ভাষার আর কী থাকে? কয়েকটা খরখরে হাড্ডি ছাড়া। মেঘনা ফার্টিলাইজার অ্যান্ড এগ্রোকেম ইন্ডাস্ট্রিজের চায়ের উইপোকা মারার একটি বিষের নাম ‘আস্থা’। সিলেট অঞ্চলের চা-বাগানিদের কাছে ‘আস্থা’ মানে সমষ্টির বিষয়। মানুষ, মাটি, পতঙ্গ, জল, মালিক, চাগাছ কি বৃষ্টি সবাই মিলেই আস্থার রূপকল্প। বহুজাতিক কোম্পানিরা ‘আস্থা’ শব্দটির মানে ও ধারণাকে বিষের বোতলে বন্দি করার ভেতর দিয়ে আস্থার আদি মানে পাল্টে দিচ্ছে। এখন আস্থা মানে হলো কোম্পানির বিষের বোতল, যদি তাতে উইপোকা না মরে তবে আস্থা হয়ে যাচ্ছে ‘অনাস্থা’। তীর, চুম্বক, দুরবিন, পাঞ্জা, লাভা, মহাশক্তি, ত্রিশূল, নিমক, বিশাল, মাঞ্জা, গর্জন, কান্ডারি, দুরন্ত, সৃজনী, বারুদ, বর্ণিল, উত্তরণ, সীমান্ত, জামানা, পরিষ্কার, মুক্তি, গুল্লি, যোশ, প্রহার, পলাশ, চিতা, শিকারি, সুরক্ষা, প্রবাল, কুসুম, শুকরিয়া, সুন্দরী, বনমারা, টক্কর, কারিশমা, কাজল, সাফ, সাথী, টেক্কা, বিনাশ এগুলো সবই করপোরেট কোম্পানির নানা রাসায়নিক বিষের নাম। বাণিজ্যিক কৃষি ক্ষেত্রেই এসব ব্যবহৃত হয়।

নয়া উদারবাদী করপোরেট পুরুষালি এই বিশ্বায়িত দুনিয়ায় এসব বহুজাতিকায়ন শ্রেণিদ্বন্দ্বকে বাণিজ্য প্রসারে সর্বদা আমলে রাখে। আর তাই রাখাল থেকে শুরু করে ‘মালিক’ (ম্যাপ এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তুলার বোলওয়ার্ম নাশক) কি ‘রাজা’ (সান করপোরেশনের চা বাগানে ব্যবহৃত বালাইনাশক) সবাইকে ‘বহুজাতিক বিষের’ প্রতিরূপ বানিয়ে ছেড়েছে। আলুর বিলম্বিত ধ্বসা রোগের জন্য মাহিন এন্টারপ্রাইজ লিমিটেড একটি বালাইনাশকের নাম দিয়েছে ‘মুসাফির (নিবন্ধন নম্বর-এপি-২৫৩৩)’। ভ্যালেন্ট টেক লিমিটেড আমের রোগদমনকারী একটি বিষের নাম রেখেছে ‘সুফি (নিবন্ধন নয়-এপি ২৪৫৮)’। বহুজাতিক এই কৃষিপণ্য বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে ভাষিক ময়দানে সাম্প্রদায়িকতা ও বৈষম্যের এক নয়া মেরুকরণ ঘটছে, যা রাষ্ট্রের তথাকথিত মূলধারায় কখনোই আলোচিত কোনো বিষয় হয়ে দাঁড়ায়নি এখনো।

সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা। অন্যদিকে, রাষ্ট্রভাষার চাপে দেশের আদিবাসী ভাষাগুলো আজ বিপন্ন, রক্তাক্ত। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, আসামের বাংলা ভাষা আন্দোলন, বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষার আন্দোলন কি অবিরাম দেশের আদিবাসী জাতিগুলোর ভাষিক সংগ্রাম সবকিছু নিয়েই কিন্তু এই ভূগোলের ভাষাজগৎ। কিন্তু নিদারুণভাবে দেশের সব আদিবাসী ভাষার মতো আজ রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলাও নানা ক্ষত ও জখম পাড়ি দিয়ে চলেছে।

নির্দয়ভাবে রাষ্ট্রভাষার সুরক্ষা ও সীমানা বদলে যাচ্ছে। চলতি আলাপে আমরা শুধু বহুজাতিক কৃষি-বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে রাষ্ট্রভাষার রূপকল্প ও নিম্নবর্গের ভাষিক মনস্তত্ত্বে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটে চলছে, তার কিছু প্রাথমিক নমুনা হাজির করেছি মাত্র। নিঃসন্দেহে এ নিয়ে বড় আয়োজনের কাজ হওয়া জরুরি। চলতি আলাপটি মূলত রাষ্ট্রভাষার ওপর আলোচিত এসব বহুজাতিক জখমের ন্যায়বিচার দাবি করছে। আশা করি, সংশ্লিষ্টরা চলতি আলাপটি বুকের গহিন থেকে পাঠ করবেন। নিশ্চয়ই তারা কোনো দিনও চাইবেন না কোনো রাসায়নিক কীটনাশকের নাম হবে ‘বিজয়’ (ইস্ট ওয়েস্ট কেমিক্যালস লিমিটেডের আখ ও ধানে ব্যবহৃত বিষ) কিংবা ‘মুক্তি’ (ইয়ন এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের চা বাগানে ব্যবহৃত বিষ)।

কৃষি ও সংস্কৃতি অভিন্ন যমজ। বহুজাতিক বিষের নাম হিসেবে দেশের জীবনপ্রবাহের সঙ্গে জড়িত প্রত্যয়গুলো কৃষি ক্ষেত্রে বহাল রেখে কোনোভাবেই কি দেশের ভাষা-সংস্কৃতির সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব? আইনের মাধ্যমে সব বহুজাতিক কৃষিপণ্যের চলতি লেখায় উল্লিখিত এমনসব নাম বাতিল করতে হবে। বাংলাসহ দেশের অপরাপর জাতিসত্তার মাতৃভাষার শব্দের মাধ্যমে কৃষি বিষ বা সংহারী বীজের নামকরণ নিষিদ্ধ করতে হবে। প্রতিটি ভাষাই জনপদ ও ভূগোলের টিকে থাকার সঞ্জীবনী। প্রিয় ভাষা বহুজাতিক বিষের বোতলে বন্দি হয়ে থাকবে আমরা কোনোভাবেই তা মেনে নিতে পারি না।

লেখক: পাভেল পার্থ, লেখক ও গবেষক

animistbangla@gmail.com

তথ্যসূত্র: দেশ রূপান্তর

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ