নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে জাতীয় অগ্রাধিকার না থাকার প্রতিফলন

প্রতি বছর ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস পালন করা হয়। এ বছর ‘নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করি, সুস্থ-সরল জীবন গড়ি’ প্রতিপাদ্যে দিবসটি পালন করা হয়েছিল।

কিন্তু দিবসে, প্রতিপাদ্যে নিরাপদ খাদ্যের দাবি যতটা জোরালোভাবে তুলে ধরা হচ্ছে, বাস্তবে তার প্রতিফলন নেই। এ পরিস্থিতি বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফলে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংস্থাটির গবেষণায় দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সংগ্রহ করা পানিতে মলজাত জীবাণু, শাকসবজিতে সিসা ও ক্যাডমিয়ামের মতো ভারী ধাতু, শিশুখাদ্যে গ্রহণযোগ্য সীমার চেয়ে বেশি সিসা, রান্নার তেলে অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট, মুড়িতে ইউরিয়া, গুড়ে নিষিদ্ধ রাসায়নিক এবং বিস্কুট ও স্ট্রিট ফুডে ক্ষতিকর সংরক্ষণকারী ও রঙের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এছাড়া নানা সময়ের গবেষণায় মুরগির মাংস, মাছ ও অন্যান্য খাদ্যপণ্যে ভারী ধাতুর উপস্থিতি এবং ফল ও সবজিতে বাড়তি কীটনাশকের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। এটা জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক।

দেশে এরই মধ্যে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ মারা যাওয়ার পেছনে ভেজাল খাদ্যের দায় রয়েছে। এছাড়া প্রায় ৫ শতাংশ মানুষ অনিরাপদ খাবার গ্রহণে ডায়ারিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন। এছাড়া দীর্ঘদিন দূষিত বা ভেজাল খাদ্য গ্রহণে ক্যান্সার, কিডনি ও লিভার, হৃদ্‌রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, স্নায়ুতন্ত্রের জটিলতা, শিশুদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রতিবন্ধকতা এবং বিভিন্ন অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। দূষিত পানি ডায়রিয়ার পাশাপাশি টাইফয়েড, হেপাটাইটিসসহ নানা পানিবাহিত রোগের কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। অনিরাপদ খাবার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতে এ পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠবে। সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিরাপদ খাদ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।

অনিরাপদ খাদ্য কোনো একক উৎস থেকে ভোক্তার কাছে পৌঁছাচ্ছে না। খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ ও বিপণন ব্যবস্থার নানা স্তরে এটি ঘটছে। দেশের কৃষিজমিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে কমে যাওয়া, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, শিল্পবর্জ্য ও দূষণের প্রভাব—সব মিলিয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের প্রথম ধাপ তথা উৎপাদনেই খাদ্য অনিরাপদ হচ্ছে। এরপর প্রক্রিয়াজাত, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বাজারজাতের বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহার, নিম্নমানের উপাদান মেশানো এবং মান নিয়ন্ত্রণের দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। ফলে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হলে পুরো খাদ্য ব্যবস্থাকে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখতে হবে।

নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের দায় ও দায়িত্ব মূলত বর্তায় বিএফএসএর। কিন্তু প্রতিষ্ঠার এক দশকের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও সংস্থাটিতে দক্ষ জনবল, পর্যাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট, আধুনিক পরীক্ষাগার এবং কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা না থাকার অভিযোগ রয়েছে। দেশের প্রতিটি জেলা ও বিভাগে কাঠামো থাকলেও জনবল ও সক্ষমতার ঘাটতির কারণে নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছেনি। তবে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব আবার কেবল বিএফএসএর একার নয়। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, কৃষি, স্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকার ও পরিবেশ খাতের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা যাবে না।

এক্ষেত্রে কিছু টেকসই উদ্যোগ নিতে হবে। উৎপাদন থেকে বাজার পর্যন্ত নজরদারি জোরদার করতে হবে। বিএফএসএর পরীক্ষাগার সক্ষমতা বৃদ্ধি, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, খাদ্যের উৎস শনাক্তের জন্য ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা চালু, নিয়মিত নমুনা পরীক্ষা এবং ফলাফল প্রকাশে অধিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন এবং অপরাধের ক্ষেত্রে শাস্তির নিশ্চয়তা দিতে হবে। এছাড়া বাজারে যেকোনো খাদ্যপণ্য বিক্রির আগে মান নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি দৃঢ় করা প্রয়োজন। পাশাপাশি ভোক্তা সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ কী কিনছে, কোত্থেকে কিনছে এবং খাদ্যের লেবেল, মেয়াদ ও মান সম্পর্কে কতটা সচেতন—এগুলোও খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে ভোক্তাদের সচেতন করার বিষয়টিও সরকারকে ভাবতে হবে। কেননা নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাই সরকারকে এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যেখানে একজন সাধারণ মানুষ উদ্বিগ্নতা ছাড়া নিরাপদ খাদ্য কিনতে পারেন।

বিশ্বের অনেক দেশ উৎপাদন থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে সমন্বিত নজরদারি, আধুনিক পরীক্ষাগার, কঠোর মান নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত পরিদর্শনের মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। বাংলাদেশের জন্যও এ পথ অনুসরণযোগ্য। নিরাপদ খাদ্য নাগরিকের মৌলিক অধিকার। দেশের সামগ্রিক অগ্রগতির জন্যও অপরিহার্য। সুস্থ-সবল জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দক্ষ মানবসম্পদ কিংবা উন্নত রাষ্ট্রের স্বপ্ন বাস্তবায়ন করা যায় না। তাই খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি কেবল আনুষ্ঠানিক আলোচনায় না রেখে মাঠপর্যায়ে নিশ্চিত করা হোক। জনস্বাস্থ্যের প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ হওয়ার পাশাপাশি খাদ্য যেন প্রয়োজনীয় পুষ্টিগুণসম্পন্ন হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ দেশের প্রায় ১০ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ অপুষ্টিতে ভুগছে। বিশেষ করে পাঁচ বছরের কম বয়সী ১০ দশমিক ৭ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টির শিকার এবং অপুষ্টির কারণে ৩ দশমিক ১ শতাংশ শিশু জন্মের পাঁচ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মারা যাচ্ছে বলে গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্স (জিএইচআই) ২০২৫-এ উল্লেখ করা হয়। এ প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করা যায়, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা কতটা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

সূত্র: বণিক বার্তা

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ