
একসময় বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, দেশের মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়া যাবে তো? স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত অর্থনীতি, সীমিত আবাদি জমি, বন্যা-খরা, দুর্বল অবকাঠামো ও দ্রুত বাড়তে থাকা জনসংখ্যার চাপে খাদ্য উৎপাদন ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। সেই বাংলাদেশ আজ ধান, মাছ, সবজি, আলু, ভুট্টা, ডিম ও মাংস উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। উচ্চফলনশীল জাত, সেচ, সার, যান্ত্রিকীকরণ ও কৃষি প্রযুক্তির বিস্তারে বেড়েছে উৎপাদন।
কিন্তু খাদ্য উৎপাদন বাড়লেই কি খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়? পুরোপুরি নয়। এখন প্রশ্ন শুধু কত খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে তা নয়; খাবার কতটা নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী, সহজলভ্য ও টেকসই, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথম বিপ্লব ছিল উৎপাদন বাড়ানোর
ধান উৎপাদন বাংলাদেশের কৃষির সবচেয়ে বড় সাফল্যের গল্প। ২০২৫ সালে দেশে মোট ধান উৎপাদন প্রায় ৬ কোটি ২০ লাখ টনে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল। একই সময়ে ভুট্টার উৎপাদনও রেকর্ড প্রায় ৫৩ লাখ টনে পৌঁছানোর সম্ভাবনা ছিল। উচ্চফলনশীল বীজ, সেচ ও কৃষি প্রযুক্তি এ অগ্রগতির অন্যতম কারণ।
তবে খাদ্য বিপ্লবের গল্প এখানেই শেষ নয়। দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও মানুষের খাদ্যাভ্যাস বদলাচ্ছে। ভাতের পাশাপাশি গমজাত খাবার, মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, ফল ও সবজির চাহিদা বাড়ছে। ফলে শুধু ধান উৎপাদন বাড়িয়ে ভবিষ্যতের খাদ্যচাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।
গমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের আমদানি নির্ভরতাও বড় চ্যালেঞ্জ। দেশে গমের উৎপাদন প্রায় ১১ লাখ টন হলেও চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করতে হয়। FAO-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর থেকে দেশে গমজাত খাবারের ব্যবহার প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
এবার প্রয়োজন পুষ্টির বিপ্লব
একজন মানুষের শুধু পেট ভরলেই হবে না, প্রয়োজন সুষম পুষ্টি। তাই ভবিষ্যতের খাদ্যনীতিতে ডাল, মাছ, ডিম, দুধ, মাংস, শাকসবজি, ফল ও তেলবীজের উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি স্থানীয় ও ঐতিহ্যবাহী পুষ্টিকর খাবারকে গুরুত্ব দিতে হবে।
অর্থাৎ লক্ষ্য হতে হবে ‘খাদ্যশস্যের নিরাপত্তা’ থেকে ‘খাদ্যব্যবস্থার নিরাপত্তা’তে যাওয়া।
নিরাপদ খাদ্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ
খাদ্য উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বেড়েছে দূষণ ও ভেজালের ঝুঁকিও। কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ, ভারী ধাতু, জীবাণু, ক্ষতিকর রাসায়নিক, অননুমোদিত রং, ভেজাল ও অপরিচ্ছন্ন উৎপাদন পরিবেশ খাদ্য নিরাপত্তার বড় হুমকি।
তাই নিরাপদ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে হবে খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত। উৎপাদন পর্যায়ে কৃষকের প্রশিক্ষণ, নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার, কীটনাশকের সঠিক প্রয়োগ, নমুনা পরীক্ষা ও ট্রেসেবিলিটির পাশাপাশি বাজার তদারকিও জোরদার করতে হবে।
ভেজাল ধরা পড়ার পর শাস্তি দেওয়ার চেয়ে উৎপাদন পর্যায়েই দূষণ প্রতিরোধ করা বেশি কার্যকর।
অপচয় বন্ধ ও কৃষকের ন্যায্যমূল্য
শুধু উৎপাদন বাড়ালেই হবে না, উৎপাদিত খাদ্য যাতে নষ্ট না হয় সেটিও নিশ্চিত করতে হবে। আধুনিক গুদাম, কোল্ড স্টোরেজ, প্যাকেজিং, দ্রুত পরিবহন ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের মাধ্যমে খাদ্য অপচয় কমানো সম্ভব।
একই সঙ্গে কৃষককে উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক টিকে না থাকলে খাদ্য নিরাপত্তাও টেকসই হবে না।
সামনে জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
বন্যা, খরা, লবণাক্ততা, অতিবৃষ্টি ও তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বাংলাদেশের কৃষি ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই ভবিষ্যতের খাদ্য বিপ্লব হতে হবে জলবায়ু সহনশীল। লবণাক্ততা ও খরাসহিষ্ণু জাত, পানি সাশ্রয়ী সেচ, স্বল্পমেয়াদি ফসল ও স্থানীয় জাত সংরক্ষণে জোর দিতে হবে।
বাংলাদেশ একসময় খাদ্যের জন্য লড়াই করেছে। এরপর লড়াই করেছে উৎপাদন বাড়ানোর জন্য। সেই লড়াইয়ে দেশ অনেক দূর এগিয়েছে। এখন শুরু করতে হবে নতুন লড়াই, নিরাপদ, পুষ্টিকর, সাশ্রয়ী ও টেকসই খাদ্যের জন্য।
আগামী দিনের খাদ্য বিপ্লবের সাফল্য তাই শুধু ধানের গোলা কতটা ভরা, তা দিয়ে মাপা যাবে না। মাপতে হবে, কত মানুষ নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাবার পাচ্ছে, কৃষক কতটা ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন, কত খাদ্য অপচয় হচ্ছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্যব্যবস্থা কতটা নিরাপদ ও টেকসই রাখা যাচ্ছে।
সেখানেই বাংলাদেশের দ্বিতীয় খাদ্য বিপ্লবের আসল পরীক্ষা।
