
খাবার মানুষের জীবনধারণের অন্যতম প্রধান উপাদান। কিন্তু সেই খাবারই যখন জীবাণু বা ক্ষতিকর উপাদানে দূষিত হয়, তখন তা পরিণত হতে পারে জনস্বাস্থ্যের বড় হুমকিতে। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এমন বহু খাদ্যদূষণের ঘটনা ঘটেছে, যেগুলো একদিকে অসংখ্য মানুষকে অসুস্থ করেছে, অন্যদিকে খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তনের পথ তৈরি করেছে।
১. জ্যাক ইন দ্য বক্স বার্গার, ১৯৯৩
১৯৯৩ সালে জ্যাক ইন দ্য বক্সের হ্যামবার্গারকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রে বড় ধরনের E. coli O157 সংক্রমণের ঘটনা ঘটে। দূষিত মাংস খেয়ে বহু মানুষ অসুস্থ হন এবং চারজনের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যনিরাপত্তা ও মাংস রান্নার মান নিয়ে ব্যাপক উদ্বেগ তৈরি করে।
এই ঘটনার পর খাদ্য প্রস্তুত ও পরিবেশনের ক্ষেত্রে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ, মাংস নিরাপদভাবে রান্না এবং খাদ্যনিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা নিয়ে আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে।
২. দূষিত পালং শাক, ২০০৬
২০০৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে কাঁচা পালং শাকের সঙ্গে E. coli সংক্রমণের ঘটনা শনাক্ত হয়। এটি দেখিয়ে দেয়, শুধু মাংস নয়- কাঁচা সবজিও উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ কিংবা সরবরাহের কোনো পর্যায়ে দূষিত হলে বড় ধরনের খাদ্যজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটতে পারে।
এ ধরনের ঘটনা খাদ্য উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত পুরো সরবরাহ ব্যবস্থায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করার গুরুত্ব আরও স্পষ্ট করে।
৩. ক্যান্টালুপে বা বাঙ্গি, ২০১১
২০১১ সালে কলোরাডোর জেনসেন ফার্মসের উৎপাদিত ক্যান্টালুপের সঙ্গে Listeria monocytogenes সংক্রমণের একটি ভয়াবহ বহুরাজ্যভিত্তিক প্রাদুর্ভাবের যোগসূত্র পাওয়া যায়। সিডিসি ও এফডিএর তদন্তে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্যান্টালুপ খাওয়ার তথ্য পাওয়া যায় এবং পরে ওই খামারের ক্যান্টালুপের নমুনায় লিস্টেরিয়া শনাক্ত হয়।
ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল, কারণ লিস্টেরিয়া সংক্রমণ বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং দুর্বল রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার মানুষের জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
৪. রোমেইন লেটুস, ২০১৮
২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রে রোমেইন লেটুসের সঙ্গে E. coli সংক্রমণের বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ঘটনাটি আবারও দেখিয়ে দেয়, দেখতে সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও তাজা মনে হওয়া কাঁচা সবজিও খাদ্যবাহিত জীবাণুর উৎস হতে পারে।
এ ধরনের প্রাদুর্ভাবের ক্ষেত্রে দ্রুত উৎস শনাক্ত করা, আক্রান্ত পণ্য বাজার থেকে প্রত্যাহার করা এবং ভোক্তাদের সতর্ক করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যজনিত রোগের তদন্তে সিডিসি, এফডিএ ও অন্যান্য সংস্থা সমন্বিতভাবে কাজ করে।
৫. দূষিত খাবারে সালমোনেলা ও লিস্টেরিয়ার বিস্তার
যুক্তরাষ্ট্রে খাদ্যদূষণের আরেকটি বড় সমস্যা Salmonella ও Listeria-র সংক্রমণ। বিভিন্ন সময়ে ডিম, মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য, সবজি ও অন্যান্য খাবারের সঙ্গে এসব জীবাণুর সংযোগ পাওয়া গেছে। সিডিসির সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর দেশীয়ভাবে অর্জিত খাদ্যজনিত অসুস্থতার কারণে আনুমানিক ৯৯ লাখ মানুষ আক্রান্ত হন এবং সাতটি প্রধান জীবাণুর কারণে প্রায় ৫৩ হাজার ৩০০ জন হাসপাতালে ভর্তি হন; মৃত্যু হয় আনুমানিক ৯৩১ জনের। এসব মৃত্যুর মধ্যে সালমোনেলা ছিল প্রধান কারণ।
খাদ্যদূষণ শুধু একটি দেশের সমস্যা নয়
যুক্তরাষ্ট্রের এসব ঘটনা দেখিয়ে দেয়, খাদ্যদূষণ কোনো নির্দিষ্ট খাবার বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও পরিবেশনের যেকোনো পর্যায়ে খাদ্য দূষিত হতে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে পুরো খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি জরুরি।
সিডিসির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিবছর প্রায় ৮০০টি খাদ্যজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব শনাক্ত হয়। এসব ঘটনা তদন্তের মাধ্যমে খাদ্যদূষণের উৎস ও কারণ শনাক্ত করা এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
খাবার আমাদের বাঁচায় কিন্তু সেই খাবার নিরাপদ না হলে তা মানুষের অসুস্থতা, এমনকি মৃত্যুর কারণও হতে পারে। তাই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা শুধু সরকারি সংস্থার দায়িত্ব নয়; উৎপাদক, ব্যবসায়ী, খাদ্য পরিবেশক এবং ভোক্তা, সবার দায়িত্বশীলতাই পারে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি কমাতে।
