খাবারের সঙ্গে আয়ুর সম্পর্ক: কী বলে গবেষণা

স্বাস্থ্যকর থাকতে সকালের নাশতায় কী খাওয়া হচ্ছে, এত দিন এ বিষয়েই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তবে নতুন এক গবেষণা বলছে, কী খাচ্ছেন তার পাশাপাশি দিনের প্রথম ও শেষ খাবার কখন খাচ্ছেন, সেটিও স্বাস্থ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩১ হাজারের বেশি মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন সম্পর্ক পেয়েছেন গবেষকেরা। চীনের হুয়াঝং ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষকদের এই গবেষণার ফল প্রকাশিত হয়েছে ইউরোপিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিকাল নিউট্রিশন সাময়িকীতে।

তবে গবেষকেরা স্পষ্ট করে বলেছেন, এটি পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা। ফলে দেরিতে নাশতা করলেই আয়ু কমে যায়, এমন সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।

৩১ হাজার মানুষের তথ্য বিশ্লেষণ

গবেষকেরা ১৯৯৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল হেলথ অ্যান্ড নিউট্রিশন এক্সামিনেশন সার্ভেতে অংশ নেওয়া ৪০ বছর বা তার বেশি বয়সী ৩১ হাজার ৪৪ জনের তথ্য বিশ্লেষণ করেন।

অংশগ্রহণকারীরা আগের ২৪ ঘণ্টায় কী খেয়েছেন বা পান করেছেন এবং কখন খেয়েছেন, সে তথ্য দিয়েছিলেন। ভোর ৪টার পর খাওয়া বা পান করা যেকোনো ক্যালরিযুক্ত খাবার বা পানীয়কে দিনের প্রথম খাবার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ফলে সবার ক্ষেত্রে এটি প্রচলিত অর্থে সকালের নাশতা ছিল না।

অংশগ্রহণকারীদের গড়ে ৮ দশমিক ৬ বছর পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ সময়ে ৭ হাজার ১২৯ জন মারা যান। তাঁদের মধ্যে ২ হাজার ২৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছিল হৃদ্‌রোগজনিত কারণে।

গবেষণায় বয়স, ধূমপান, শারীরিক পরিশ্রম, খাবারের মান, ওজন, দৈনিক ক্যালরি গ্রহণ, আয় এবং আগে থেকে থাকা বিভিন্ন রোগের মতো বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া হয়।

প্রথম খাবার যত দেরি, ঝুঁকিও তত বেশি?

গবেষণায় দেখা যায়, দিনের প্রথম খাবার খাওয়ার সময় যত পিছিয়েছে, মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে তত বেশি সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় সকাল ৮টা থেকে ১০টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের যেকোনো কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি প্রায় ১০ শতাংশ বেশি ছিল।

সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টার মধ্যে প্রথম খাবার খেলে এ ঝুঁকি প্রায় ১৯ শতাংশ এবং দুপুর ১২টার পর প্রথম খাবার খেলে প্রায় ২৯ শতাংশ বেশি দেখা গেছে।

হৃদ্‌রোগজনিত মৃত্যুর ক্ষেত্রেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়। গবেষণার হিসাবে, দুপুরের পর প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের হৃদ্‌রোগে মৃত্যুর ঝুঁকি সকাল ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে প্রথম খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় প্রায় ৪৬ শতাংশ বেশি ছিল।

গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, দুপুরের পর প্রথম খাবার খাওয়া ৫০ বছর বয়সী ব্যক্তিদের গড় আয়ু প্রায় ২ দশমিক ৪৬ বছর কম হতে পারে। তবে এটি গবেষণায় পাওয়া একটি পরিসংখ্যানগত সম্পর্ক, কোনো ব্যক্তির আয়ু কমে যাওয়ার নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়।

রাতের খাবারে ভিন্ন চিত্র

দিনের শেষ খাবারের ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকির সঙ্গে সময়ের সম্পর্ক সরলরৈখিক ছিল না। গবেষণায় এখানে অনেকটা ইংরেজি ‘U’ অক্ষরের মতো সম্পর্ক দেখা গেছে।

রাত ৭টা থেকে ৮টার মধ্যে শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের তুলনায় সন্ধ্যা ৭টার আগেই শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের মৃত্যুঝুঁকি প্রায় ১৩ শতাংশ বেশি ছিল। অন্যদিকে রাত ১২টার পর শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের ঝুঁকি ছিল প্রায় ২৭ শতাংশ বেশি।

গবেষণায় সবচেয়ে কম ঝুঁকি দেখা গেছে রাত ৮টার আশপাশে শেষ খাবার খাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে। তবে গবেষণার প্রধান লেখক ঝিলেই শান সতর্ক করে বলেছেন, এর অর্থ এই নয় যে সবার জন্য রাত ৮টায় রাতের খাবার খাওয়াই আদর্শ।

গবেষকদের ধারণা, গভীর রাতে খাবার খেলে শরীরের স্বাভাবিক জৈবিক ঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ব্যাহত হতে পারে। এর ফলে বিপাকক্রিয়ায়ও প্রভাব পড়তে পারে। রক্তে গ্লুকোজ ও চর্বির বিপাক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন আসার সম্ভাবনাও রয়েছে।

তবে মানুষের ক্ষেত্রে খাবারের সময়ের সঙ্গে এসব জৈবিক পরিবর্তন এবং মৃত্যুঝুঁকির সরাসরি সম্পর্ক এখনো নিশ্চিত নয়।

খুব তাড়াতাড়ি খাওয়ার ক্ষেত্রেও ঝুঁকি

গবেষণায় সন্ধ্যা ৭টার আগেই দিনের শেষ খাবার শেষ করা ব্যক্তিদের মধ্যেও তুলনামূলক বেশি মৃত্যুঝুঁকি দেখা গেছে। তবে গবেষকেরা মনে করেন, এর সঙ্গে খাবারের সময়ের সরাসরি সম্পর্ক নাও থাকতে পারে।

কারণ, যারা খুব তাড়াতাড়ি খাওয়া শেষ করতেন, তাঁদের একটি বড় অংশ তুলনামূলক বেশি বয়সী ছিলেন এবং দিনে কমবার খাবার খেতেন। তাঁদের আগে থেকেই বিভিন্ন স্বাস্থ্যগত সমস্যার প্রবণতাও বেশি ছিল।

অর্থাৎ খুব তাড়াতাড়ি খাওয়ার বিষয়টি হয়তো অসুস্থতার কারণ নয়; বরং কারও অসুস্থতা বা স্বাস্থ্যগত অবস্থার কারণে তিনি এমন সময়ে খাবার খেতে পারেন।

শুধু কতক্ষণ না খেয়ে থাকছেন, সেটিই নয়

বর্তমানে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খাবার খাওয়ার পদ্ধতি বা time-restricted eating জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে গবেষণাটি ইঙ্গিত দিচ্ছে, দিনে কত ঘণ্টা খাবার খাওয়া হচ্ছে বা কতক্ষণ না খেয়ে থাকা হচ্ছে, শুধু এটুকু দিয়ে স্বাস্থ্যঝুঁকি ব্যাখ্যা করা যায় না।

কখন দিনের প্রথম খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। গবেষকদের মতে, খাবারের সময় শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের জৈবিক ঘড়ির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকেত হিসেবে কাজ করতে পারে।

তবে এই গবেষণার কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। অংশগ্রহণকারীদের খাবারের সময় মূলত এক দিনের ২৪ ঘণ্টার তথ্যের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা হয়েছিল। ফলে দীর্ঘদিনের নিয়মিত খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে এই তথ্য পুরোপুরি নাও মিলতে পারে।

এ ছাড়া ঘুমের সময়, শারীরিক পরিশ্রম, শরীরের জৈবিক ঘড়ি, শিফটে কাজ করা এবং আর্থসামাজিক অবস্থার মতো বিষয়ও খাবারের সময়কে প্রভাবিত করতে পারে।

তাই গবেষকেরা পরামর্শ দিয়েছেন, শুধু এই গবেষণার ফলের ভিত্তিতে কারও খাবারের সময়সূচিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা উচিত নয়। বরং নিয়মিত ও সুষম খাবার, পর্যাপ্ত ঘুম, শারীরিক পরিশ্রম এবং ব্যক্তির স্বাস্থ্যগত অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ