পানির বোতলে বন্দি প্রকৃতি

জলের মালিকানা, জলবায়ু সংকট আর করপোরেট মুনাফার গল্প

রাজধানীর কারওয়ান বাজারের এক করপোরেট অফিসের এন্ট্রি লেভেলের কর্মী রাফি। দুপুরে অফিস থেকে বেরিয়ে রাস্তার পাশে দাঁড়ান। আগস্টের ভ্যাপসা গরমে তার শার্ট পিঠে লেগে আছে। পানি চাইতেই চায়ের দোকানদার পাশে রাখা জার দেখিয়ে দেন। রাফি ভরসা করতে পারেন না। হাফ লিটারের একটা পানির বোতল কিনে ফেলেন ২০ টাকায়। ঢাকনা খুলে কয়েক ঢোক ঠান্ডা পানি খেতেই শরীর যেন একটু স্বস্তি পায়।

কিন্তু রাফি জানেন না, ঠিক সেই মুহূর্তে পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কোনো নদীর পানি নেমে যাচ্ছে ইতিহাসের সর্বনিম্ন স্তরে, কোনো কৃষক বৃষ্টির অপেক্ষায় শুকনো জমির দিকে তাকিয়ে আছেন, কোথাও মানুষ পানির লাইনে দাঁড়িয়ে।

বোতলে বন্দি প্রকৃতি

একটা নদী, ঝরণা কিংবা একটা ভূগর্ভস্থ জলস্তর; হাজার বছর ধরে এগুলো ছিল প্রকৃতির নিজস্ব সম্পদ। অথচ আজ সেই একই পানি প্লাস্টিকের বোতলে ভরে বিক্রি হচ্ছে শত শত বিলিয়ন ডলারের এক বৈশ্বিক বাজারে। এখন তাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন: পানি আসলে কার? যে নদী বা ঝরণা থেকে তোলা হচ্ছে, তার মালিক কি বিশ্বের সমস্ত মানুষ? নাকি রাষ্ট্র? নাকি যে কোম্পানি সেটা তুলে বোতলে ভরছে? আর যখন পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হচ্ছে, খরা দীর্ঘ হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নামছে—তখন এই মালিকানা প্রশ্নের গুরুত্ব ক্রমেই বাড়ছে।

এক বোতল পানির পেছনে লুকিয়ে আছে অনেক রকমের গল্প। আছে নিরাপদ পানির অভাবে ভোগা কোটি মানুষের বাস্তবতা। আছে প্লাস্টিক বর্জ্যে ভরে ওঠা নদী আর শহরের কান্না। আছে হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকা এক মুনাফাকেন্দ্রিক বাজার।
আছে জলবায়ু সংকটের ছায়ায় ক্রমশ দামি হয়ে ওঠা ওই প্রাকৃতিক আশীর্বাদের করপোরেট বাজার—যা একসময় প্রায় বিনামূল্যে সবার নাগালে ছিল। রাফির হাতের বোতলটা তাই শুধু এক ঢোক পানি নয়। সেটা প্রকৃতি বনাম বাজার, অধিকার বনাম পণ্য বিতর্কেরই এক ছোট্ট প্রতিচ্ছবি।

নিরাপদ পানির অধিকার প্রশ্ন

ডব্লিউএইচও–ইউনিসেফের যৌথ পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির (JMP) ২০২৫ সালের প্রতিবেদনের ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, পৃথিবীর প্রতি চারজন মানুষের একজন (অর্থাৎ প্রায় ২১০ কোটি মানুষ) নিরাপদভাবে ব্যবস্থাপিত পানীয় জলের আওতার বাইরে। তাদের মধ্যে ১০ কোটি ৬ লাখ মানুষ এখনো নদী, হ্রদ বা অন্য ভূপৃষ্ঠের অপরিশোধিত পানি সরাসরি পান করেন।

প্রতিবেদনটি ২০০০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সময়ের অগ্রগতি ও বৈশ্বিক পানির পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছে এবং ২০২৫ সালের ২৬ আগস্ট প্রকাশিত হয়।
এ দিকে জাতিসংঘ বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি, পরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিষয়ক ইনস্টিটিউট (UNU-INWEH) ২০২৩ সালে Global Bottled Water Industry: A Review of Impacts and Trends শিরোনামে একটি বৈশ্বিক পর্যালোচনা প্রকাশ করে। ১০৯টি দেশের তথ্য বিশ্লেষণ করা ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বোতলজাত পানির প্রতি লিটারের দাম পৌরসভার সরবরাহ করা কলের পানির চেয়ে ১৫০ থেকে ১ হাজার গুণ পর্যন্ত বেশি হতে পারে।

করপোরেট মুনাফার গল্প

UNU-INWEH-এর পর্যালোচনা অনুযায়ী, বৈশ্বিক বোতলজাত পানির বার্ষিক বিক্রি প্রায় ২৭০ বিলিয়ন ডলার এবং ৩৫০ বিলিয়ন লিটার। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলো মিলিয়ে এই বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশ। এই পুরো বাজারের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে হাতে গোনা কয়েকটি বহুজাতিক কোম্পানির হাতে।
শিল্প বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানগুলোর হিসাবে, বৈশ্বিক বোতলজাত পানির বাজারে বড় খেলোয়াড়দের মধ্যে রয়েছে নেসলে, ড্যানোন, কোকা-কোলা ও পেপসিকো; এর পাশাপাশি প্রিমো ব্র্যান্ডস, নংফু স্প্রিং ও বিসলেরির মতো বড় আঞ্চলিক কোম্পানিও রয়েছে।

Statista-এর একটি বৈশ্বিক ব্র্যান্ড বিশ্লেষণে কোকা-কোলার Dasani-এর বাজার-শেয়ার ১২ শতাংশ এবং Danone-এর Evian-এর ৯ শতাংশ দেখানো হয়েছে। Fortune Business Insights-এর হিসাবে, বৈশ্বিক বোতলজাত পানির বাজার ২০২৫ সালে ছিল ৩২৬. ০৭ বিলিয়ন ডলারের। ২০২৬ সালের অনুমিত বাজার প্রায় ৩৪০.৪১ বিলিয়ন ডলারের। আর তা বেড়ে ২০৩৪ সালে প্রায় ৫৩৯.৫২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অর্থাৎ যে পানি একসময় ছিল প্রকৃতির উন্মুক্ত সম্পদ, তা আজ মুষ্টিমেয় করপোরেশনের হাতে ক্রমবর্ধমান মুনাফার উৎস। সেই মুনাফা বাড়ছে ঠিক তখনই, যখন বিশ্বের বহু মানুষের কাছে নিরাপদ কলের পানিই এখনও অধরা।

বাংলাদেশের কী হাল

পানি পাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চিত্রটি আপাতদৃষ্টিতে ভালো। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউনিসেফ বাংলাদেশের Bangladesh Multiple Indicator Cluster Survey 2025 (MICS 2025) অনুযায়ী, দেশের ৯৮.৬ শতাংশ মানুষ অন্তত মৌলিক পানীয় জলের সেবা ব্যবহার করে। কিন্তু পানির নিরাপত্তার মানদণ্ডে চিত্রটি অনেক বেশি উদ্বেগজনক।

ওই জরিপে পানির উৎসে পরীক্ষিত নমুনার ৪৭.১ শতাংশে E. coli পাওয়া গেছে। মানুষের পান করার পর্যায়ে সংগৃহীত নমুনায় এই হার বেড়ে হয়েছে ৮৫ শতাংশ।
“Safely managed” পানীয় জলের আওতায় রয়েছে দেশের ৪২.৬ শতাংশ মানুষ। তবে আর্সেনিক ও E. coli দূষণ বিবেচনায় নিলে এই হার আরও নিচে নামে। WHO-এর আর্সেনিক মানদণ্ড ব্যবহার করলে হার ৩৭.১ শতাংশ, আর বাংলাদেশ সরকারের আর্সেনিক মানদণ্ড ব্যবহার করলে ৩৯.৪ শতাংশ। অর্থাৎ বাংলাদেশে পানি পাওয়া আর নিরাপদ পানি পাওয়া এখনও এক কথা নয়।

ঢাকার ক্ষেত্রে নিরাপদ পানির প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরবরাহব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা-অনাস্থার প্রশ্ন। ঢাকা ওয়াসার গ্রাহকেরা কত শতাংশ পানি ফুটিয়ে বা পরিশোধন করে পান করছেন—এমন নির্ভরযোগ্য সাম্প্রতিক কোনও পরিসংখ্যান হাতের কাছে পাওয়া যাচ্ছে না।
তবে তানজিলা আক্তার সাথী ও সহগবেষকদের ২০২৪ সালের Microbiological Safety of Drinking Water in Dhaka City: A Study on Supply and Treated Water in Dhaka, Bangladesh গবেষণাটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ইশারা হতে পারে। Stamford Journal of Microbiology-এ প্রকাশিত গবেষণাটিতে ঢাকার সিদ্ধেশ্বরী, সোনারগাঁও, মিরপুর ও বাড্ডা থেকে মোট ১৬টি পানির নমুনা পরীক্ষা করা হয়।

এর মধ্যে চারটি supply point, ছয়টি consumer point এবং ছয়টি treated water-এর নমুনা। গবেষণায় সব নমুনাতেই বিভিন্ন অণুজীবের উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষকেরা বলেন, পানিশোধন প্রক্রিয়া সব রোগজীবাণু দূর করতে যথেষ্ট কার্যকর ছিল না এবং পরিশোধনের পরও দূষণ ঘটতে পারে।
এই গবেষণার নমুনা ছোট এবং এটি পুরো ঢাকা শহর বা ঢাকা ওয়াসার সামগ্রিক পানির মানের প্রতিনিধিত্ব করে না। তবে এটি অন্তত দেখায়, পানির উৎস থেকে গ্রাহকের গ্লাস পর্যন্ত পৌঁছানোর পথটিও নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

এখন প্রশ্ন হলো, বোতলজাত পানি কতটুকু নিরাপদ? তানজিলা আক্তার সাথী ও সহগবেষকদের গবেষণায় ঢাকার বাজার থেকে ৩০টি বোতলজাত পানির নমুনা পরীক্ষা করেন গবেষকেরা। মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষায় নমুনাগুলোতে total coliform, E. coli, fecal coliform ও Salmonella spp. পাওয়া যায়নি। Water Quality Index অনুযায়ী ৭০ শতাংশ নমুনা “good” শ্রেণিতে ছিল। ফলে ঢাকার সব বোতল বা জারের পানি অনিরাপদ—এমন দাবি করা যাচ্ছে না।
বরং প্রশ্নটা আরও মৌলিক: নিরাপদ পানির নিশ্চয়তা দেওয়ার দায়িত্ব কার, এবং সেই নিশ্চয়তা নিয়মিত পরীক্ষা করে কে?

পানিতে সর্বনাশা প্লাস্টিকের আচ্ছাদন

পানির বন্দিত্বের সঙ্গে আসে প্লাস্টিকের সর্বনাশা মচ্ছবের প্রসঙ্গ। UNU-INWEH-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, ২০২১ সালে বোতলজাত পানির শিল্প প্রায় ৬০০ বিলিয়ন প্লাস্টিক বোতল ও কনটেইনার উৎপাদন করেছিল, যার সঙ্গে প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ টন PET বর্জ্য যুক্ত হয়। এর বেশিরভাগই পুনর্ব্যবহার হয়নি এবং ল্যান্ডফিল বা অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় গেছে।

নেমে যাচ্ছে পানির স্তর, ঘনিয়ে আসছে জলবায়ু সংকট

পানির উৎস নিয়েও প্রশ্ন কম নয়। UNU-INWEH-এর প্রতিবেদন বলছে, বহু দেশে বোতলজাত পানি কোম্পানিগুলো কী পরিমাণ ভূগর্ভস্থ বা ভূপৃষ্ঠের পানি তুলছে, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পানি উত্তোলনের পরিমাণ নিয়ে বৈশ্বিক তথ্যভান্ডার অত্যন্ত সীমিত।

উদাহরণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা স্প্রিংস থেকে নেসলে ওয়াটার্স দৈনিক প্রায় ৩০ লাখ লিটার এবং ফ্রান্সের Evian-les-Bains এলাকা থেকে Danone দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ১ কোটি লিটার পানি তুলত। জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নে বৃষ্টিপাতের ধরন পাল্টে যাচ্ছে, হিমবাহ ও তুষারস্তর দ্রুত গলছে, আর দীর্ঘ হচ্ছে খরার মেয়াদ। জাতিসংঘের পানি-সংক্রান্ত প্রতিবেদনের হিসাবে, বিশ্বের প্রায় অর্ধেক মানুষ বছরের অন্তত কিছু সময় তীব্র পানি সংকটে ভোগেন।

২০২৫ সালে Nature Communications-এ প্রকাশিত এক গবেষণা “Day Zero Drought” নামে অভিহিত এমন পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে, যেখানে দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টির ঘাটতি, নদীর প্রবাহ কমে যাওয়া এবং পানির চাহিদা বৃদ্ধির মতো একাধিক সংকট একসঙ্গে দেখা দেয়।

গবেষণাটি বলছে, বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ২০২০ ও ২০৩০-এর দশকেই এমন পরিস্থিতির উচ্চ ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং উত্তর আমেরিকার কিছু অংশকে গবেষণায় ধারাবাহিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ hotspot হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

বাংলাদেশেও এর ছাপ স্পষ্ট—ইউনিসেফ বাংলাদেশের তথ্যমতে, উপকূলীয় এলাকায় জলবায়ু-জনিত সমুদ্রের লবণাক্ততা বৃদ্ধি পানির উৎসকে আরও দূষিত ও অপ্রতুল করে তুলছে।

UNU-INWEH-এর প্রতিবেদন একই সঙ্গে সতর্ক করেছে, বৈশ্বিক দক্ষিণের যেসব দেশে নিরাপদ কলের পানি এখনো নিশ্চিত নয়, জলবায়ু সংকট তীব্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোই বোতলজাত পানির শিল্পের ভবিষ্যৎ বড় বাজার হয়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ প্রকৃতি ও জলবায়ু বিপর্যয় থেকেই বাড়তে পারে করপোরেট মুনাফা।

সূত্র: Dhara News

আরও সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ