
খাবার আমাদের শরীরের পুষ্টির প্রধান উৎস। তবে কিছু খাবার ও খাদ্য উপাদান নিয়মিত বা অতিরিক্ত গ্রহণ করলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে। এসব খাবারে থাকা কিছু রাসায়নিক যৌগ ও ক্ষতিকর পদার্থ শরীরের কোষের ডিএনএতে পরিবর্তন ঘটাতে পারে।
ক্যান্সার সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত এমন উপাদান, তেজস্ক্রিয় বিকিরণ বা অণুজীবকে কারসিনোজেন বলা হয়। এগুলো মানবদেহের কোষে জিনগত পরিবর্তন ঘটিয়ে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
উচ্চ তাপে রান্না করা মাছ-মাংস
মাছ ও মাংস উচ্চ তাপমাত্রায় রান্নার সময় হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইনস (এইচসিএ) ও পলিসাইক্লিক অ্যারোমেটিক হাইড্রোকার্বন (পিএএইচ) নামের রাসায়নিক যৌগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে মাংস গ্রিল করা, আগুনে ঝলসানো, কাবাব তৈরি ও অতিরিক্ত ভাজার সময় এসব যৌগ বেশি তৈরি হতে পারে।
এসব যৌগ কারসিনোজেন হিসেবে বিবেচিত এবং দীর্ঘদিন অতিরিক্ত সংস্পর্শে থাকলে কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে।
অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত শর্করাজাতীয় খাবার
কার্বোহাইড্রেট বা শর্করা সমৃদ্ধ খাবার উচ্চ তাপমাত্রায় ভাজা বা সেঁকার সময় অ্যাক্রিলামাইড নামের একটি রাসায়নিক যৌগ তৈরি হতে পারে। ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, ক্র্যাকার, চিপস, তেলেভাজা বিস্কুট ও চানাচুরের মতো খাবারে এ ধরনের যৌগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের খাবার নিয়মিত ও অতিরিক্ত খাওয়ার সঙ্গে পরিপাকতন্ত্র ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক নিয়ে গবেষণা রয়েছে। তাই অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ তাপে তৈরি খাবার সীমিত রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ট্রান্সফ্যাটযুক্ত ফাস্টফুড
চিপস, চানাচুর, শিঙাড়া, পেঁয়াজু, পিৎজা ও বার্গারের মতো বিভিন্ন ফাস্টফুডে ট্রান্সফ্যাট থাকতে পারে। অতিরিক্ত ট্রান্সফ্যাট গ্রহণ শরীরে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ ও কোষের ক্ষতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
গবেষণায় উচ্চমাত্রায় ট্রান্সফ্যাট গ্রহণের সঙ্গে কলোরেক্টাল, ওভারিয়ান ও প্রোস্টেট ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তাই ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার যতটা সম্ভব সীমিত রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
প্রিজারভেটিভযুক্ত প্রক্রিয়াজাত মাংস
সসেজ, হ্যাম, বেকন ও হটডগসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত মাংসে নাইট্রেট ও নাইট্রাইটজাত প্রিজারভেটিভ ব্যবহার করা হয়। উচ্চ তাপের সংস্পর্শে এসব উপাদান থেকে ক্ষতিকর যৌগ তৈরি হতে পারে।
প্রক্রিয়াজাত মাংস নিয়মিত খাওয়ার সঙ্গে বিভিন্ন ক্যান্সারের ঝুঁকির সম্পর্ক পাওয়া গেছে। বিশেষ করে পাকস্থলীর ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতেও এসব খাবার ভূমিকা রাখতে পারে।
তামাক ও তামাকজাত পণ্য
তামাক ও তামাকজাত পণ্য ক্যান্সারের অন্যতম পরিচিত ঝুঁকির কারণ। তামাকের ধোঁয়ায় নাইট্রোসামিনসহ বিভিন্ন কারসিনোজেন থাকে। তামাক ব্যবহারে মুখ ও ফুসফুসের ক্যান্সারের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়।
তাই ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে তামাকজাত পণ্য সম্পূর্ণ এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
কীটনাশকের অবশিষ্টাংশযুক্ত খাবার
ভেজাল খাবারের পাশাপাশি শাকসবজি ও ফলমূলে কীটনাশকের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কিছু কীটনাশকে ভারী ধাতু, অর্গানোফসফেটসহ বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান থাকতে পারে। এসব রাসায়নিকের কিছু অংশ শাকসবজি ও ফলে অবশিষ্ট থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন ধরে নির্দিষ্ট কিছু কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকলে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। তাই ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে পরিষ্কার করে খাওয়া এবং নিরাপদ উৎস থেকে খাদ্য সংগ্রহের বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
অ্যালকোহল
অ্যালকোহল পান করার পর শরীরে অ্যাসিটালডিহাইড তৈরি হয়। এটি ক্যান্সার সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত একটি উপাদান। নিয়মিত অ্যালকোহল পান করলে পরিপাকতন্ত্র, লিভারসহ বিভিন্ন অঙ্গের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
ঝুঁকি কমাতে কী করবেন
ক্যান্সারের ঝুঁকি কমাতে অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত ও উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো খাবার, ট্রান্সফ্যাটযুক্ত খাবার এবং প্রক্রিয়াজাত মাংস সীমিত রাখা জরুরি। পাশাপাশি ফল ও শাকসবজি ভালোভাবে পরিষ্কার করে খাওয়া, নিরাপদ খাদ্য বেছে নেওয়া এবং তামাক ও অ্যালকোহল এড়িয়ে চলা গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কোনো একটি খাবার খেলেই ক্যান্সার হবে—এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক নয়। ক্যান্সারের ঝুঁকি নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাসের পাশাপাশি বয়স, জীবনযাপন, বংশগত কারণ ও পরিবেশসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর। তাই ব্যক্তিগত ঝুঁকি অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস নির্ধারণে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।
