
অনিয়মের দায়ে চট্টগ্রামের দুই খাদ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান এবং একটি সুপারশপকে মোট ৩৯ লাখ টাকা জরিমানা করেছেন চট্টগ্রামের বিশুদ্ধ খাদ্য আদালত। এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সংরক্ষণ, খাবার তৈরির স্থানে তেলাপোকা ও পোকামাকড়ের উপস্থিতি, পোড়া তেলে খাদ্য তৈরিসহ বিভিন্ন অভিযোগ পাওয়া গেছে।
প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো—ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারি, মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেড ও উৎসব সুপারশপ। এর মধ্যে ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারিকে ১৯ লাখ টাকা এবং মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস ও উৎসব সুপারশপকে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
আজ রবিবার সকালে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরহান ইসলাম কালের কণ্ঠকে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গতকাল শনিবার সকাল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত চট্টগ্রাম নগরে অবস্থিত তিনটি খাদ্য প্রতিষ্ঠানে সংক্ষিপ্ত বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারি
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারির কারখানায় নিম্নমানের ঘি ব্যবহার করে বেকারি পণ্য উৎপাদন এবং মানহীন ঘি উৎপাদন ও খাদ্য প্রস্তুতে ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। পচা-বাসি মিষ্টির উচ্ছিষ্টাংশ সংরক্ষণ ও ব্যবহারের উদ্দেশ্যে রাখা, মেয়াদোত্তীর্ণ মিষ্টি, কেক ও বিস্কুট সংরক্ষণ এবং খাদ্যপণ্যে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং পুষ্টিতথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ না করার বিষয়ও ধরা পড়ে।
এ ছাড়া কারখানায় স্যাঁতসেঁতে ফ্লোর, ভাঙা টাইলস ও অপরিচ্ছন্ন ড্রেনেজ ব্যবস্থা ছিল। নোংরা কম্বল দিয়ে দই তৈরিতে জাক দেওয়া, পোকাযুক্ত বাদাম ব্যবহার এবং ময়লাযুক্ত বেলুন, চামচ ও ছুরি দিয়ে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিষয়ও পাওয়া যায়। ফ্রিজারে মেয়াদহীন খাবার সংরক্ষণ করা হচ্ছিল বলেও জানিয়েছেন অভিযানে থাকা কর্মকর্তারা।
কারখানাটির ব্যাবসায়িক ও মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সনদ না থাকা এবং নিবন্ধন ছাড়াই ঘি উৎপাদনের অভিযোগও পাওয়া যায়। বিচারিক কার্যক্রমের সময় বিভিন্ন কক্ষ, ড্রয়ার ও ফ্রিজার তালাবদ্ধ করে রেখে আদালতকে অসহযোগিতার অভিযোগও রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস
মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস লিমিটেডের কারখানায় বিভিন্ন ধরনের চিপস, নুডলস ও ম্যাংগো বারের গুণগত মান যথাযথভাবে নিয়ন্ত্রণ ও নিশ্চিত না করার বিষয়টি ধরা পড়ে। মানহীন খাদ্যদ্রব্য বিক্রির উদ্দেশ্যে প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছিল।
কারখানার বিভিন্ন স্থানে তেলাপোকার বিচরণ দেখা যায়। ম্যাংগো বার তৈরির কাঁচামাল পাল্পের ড্রামের ভেতরও বিভিন্ন ধরনের পোকামাকড় পাওয়া যায়। বিভিন্ন স্থানে ফ্লোর ভাঙা ও তৈলাক্ত ছিল। নির্দিষ্ট বিরতিতে চুলা পরিষ্কার না করে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে নিমকি ও চিপস উৎপাদন করা হচ্ছিল।
এ ছাড়া বর্জ্য পদার্থ সংরক্ষণ, খাদ্যপণ্য প্রক্রিয়াকরণে পোড়া তেল ব্যবহার এবং মেয়াদ উল্লেখ না থাকা পটেটো স্টিকস সংরক্ষণের বিষয়ও পাওয়া যায়। ব্যবহৃত তেল ও ম্যাংগো পাল্পেও যথাযথভাবে মেয়াদ উল্লেখ ছিল না বলে জানিয়েছে অভিযান সংশ্লিষ্টরা।
উৎসব সুপারশপ
উৎসব সুপারশপে মানহীন আচার ও নিম্নমানের হোমমেড পণ্য বিক্রি, অত্যন্ত নোংরা পরিবেশে মাংস সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং মেয়াদোত্তীর্ণ মোমোস সংরক্ষণ ও বিক্রির প্রমাণ পাওয়া যায়।
পরিদর্শনে খেজুরসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যে নির্ধারিত পদ্ধতিতে লেবেলিং না করার বিষয়টি ধরা পড়ে। আমদানীকৃত জুস, মধু, পানি, বাদাম, এনার্জি ড্রিংকস, অলিভ অয়েল ও সয়াসসসহ বিভিন্ন পণ্যে আমদানিকারক ও পুষ্টিতথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ ছিল না। কিছু পণ্যে বাংলায় পুষ্টি তথ্য না থাকা এবং নিজস্ব স্টিকার দিয়ে পুষ্টি তথ্য ঢেকে রাখার বিষয়ও পাওয়া যায়।
এ ছাড়া যথাযথ আমদানিকারকের তথ্য ছাড়া খাদ্যপণ্য বিক্রি, জিলাপিতে ব্যবহৃত রঙের তথ্য না দেওয়া, একই চপিং বোর্ড ও দা-ছুরি দিয়ে গরু ও খাসির মাংস প্রক্রিয়াজাত করা, কোল্ড স্টোরেজ নিয়মিত চালু না রাখা এবং নষ্ট মরিচ, মসলা ও চকোলেট সংরক্ষণ ও বিক্রির অভিযোগ পাওয়া যায়।
নিবন্ধন ছাড়া শিশুখাদ্য ও অনুমোদনবিহীন ফুড সাপ্লিমেন্ট বিক্রি এবং পপকর্ন ও ক্যারামেল তৈরিতে খোলা তেল ব্যবহারের বিষয়ও ধরা পড়ে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের নিরাপদ খাদ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরহান ইসলাম বলেন, তিনটি প্রতিষ্ঠানে অভিযানের সময় বিভিন্ন অনিয়ম ধরা পড়েছে। এসব অনিয়মের অভিযোগে নিরাপদ খাদ্য আইন অনুযায়ী ফ্লেভারস সুইটস অ্যান্ড বেকারিকে ১৯ লাখ টাকা এবং মেরিডিয়ান ফুড প্রোডাক্টস ও উৎসব সুপার শপকে ১০ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ
