
গাজীপুরের শ্রীপুরে মাছের খামারগুলোতে দেদার চলছে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার। যার চরম মূল্য দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। পোলট্রি শিল্পে অনিয়ন্ত্রিত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের পর সেই মুরগির মল যখন মাছের খাদ্য হয়, তখন তৈরি হয় এক ভয়াবহ চক্র। রান্নার পরও মাছের শরীরে থাকা এই অ্যান্টিবায়োটিক ধ্বংস হয় না, বরং তা মানুষের দেহে প্রবেশ করে প্রয়োজনীয় ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট করে দিচ্ছে। একদিকে মাছ হারাচ্ছে তার চিরচেনা স্বাদ, অন্যদিকে মানুষের শরীরে বাসা বাঁধছে নীরব বিষ।
বছরের পর বছর অবৈধ অস্বাস্থ্যকর বিষ্ঠার ব্যবহার চললেও নিয়ন্ত্রণের তাগিদ নেই মৎস বিভাগের। স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী বিভিন্ন অঞ্চলের প্রভাবশালী মাছ চাষিদের জন্য বিভিন্ন মুরগির খামার থেকে স্বল্পমূল্যে বিষ্ঠা কিনে মাছের খামারিদের কাছে বেশি দামে বিক্রি করছেন। পরে সে বিষ্ঠাগুলো নিজেদের মাছের খামারে ব্যবহার করেন মাছের খাদ্য হিসেবে। এটি খুবই অস্বাস্থ্যকর। তবুও লোভে পড়ে বেশি লাভের আশায় তারা এমন অসৎ উপায় অবলম্বন করছেন। এতে এসব মাছ খেয়ে একদিকে মানুষের মধ্যে রোগবালাই বাড়ছে অপর দিকে পরিবেশও নষ্ট হচ্ছে চরম ভাবে। অনেক মাছের খামারিরা চলাচলের রাস্তার পাশেই মুরগির বিষ্ঠার স্তূপ করে রাখেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে উপজেলার বিভিন্ন মাছের খামারে চলছে মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার। এতে মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিসহ পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে দিনের পর দিন। এমন নিষিদ্ধ অপরাধমূলক কাজ চললেও স্থানীয় মৎস্য অধিদপ্তর কোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না। এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে।
সাতখামাইর এলাকার বাসিন্দা আল আমীন জানান রেলের পাশে সড়ক ধরে কাওরাইদ যাওয়ার পথে দুইপাশের সব খামারেই মুরগির বিষ্ঠার ব্যবহার চোখে পড়ে। এ সড়কে চললে দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ পথচারীরা। এ দুর্ভোগ থেকে পরিত্রাণ দরকার। পূর্ব সোনাবো গ্রামের বাসিন্দা শ্রী গগেন্দ্র চন্দ্র সিংহ জানান, আমার ঘরের পাশ ঘেঁষেই মুরগির বিষ্ঠা ফেলে স্তূপ করে রেখেছেন স্থানীয় এক মাছচাষি। দুর্গন্ধে বাড়িতে টিকে থাকাই চরম কষ্ট। মাছচাষিরা প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের ভয়ে কিছু বলা যায় না। আমরা নিরুপায় হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছি। আমাদের কষ্ট কেউ বুঝে না। বাড়িতে শিশু-নারী-বৃদ্ধ সবাই দুর্গন্ধে অতিষ্ঠ। গরমের দিনে জানালা খুলতে পারি না। ঘরের দুই চার হাতের মধ্যেই মুরগির বিষ্ঠার বস্তা স্তূপ করে রাখা।

ছবি: সংগৃহীত
মাছ বিক্রেতা সামিরুল বলেন, আমরা বিভিন্ন খামার থেকে মাছ সংগ্রহ করি। পরে তা বিভিন্ন হাটেবাজারে বিক্রি করি। তিনি বলেন, যে সব মাছের খামারে মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার করে খাদ্য হিসেবে সেসব খামারে মাছ ধরতে ভালো লাগে না। তবুও পেটের (জীবিকা) দায়ে করি। মানুষ টাকা দিয়ে বিষ কিনে খায়।
পোলট্রি খামারি কাজল মিয়া বলেন, বিভিন্ন এলাকার বেশ কিছু লোক টমটম নিয়ে মুরগির ফার্মে এসে নিজ দায়িত্বে বস্তা ভরে বিষ্ঠা নিয়ে যায়। এতে আমাদের ফার্ম পরিষ্কারের ঝামেলা পোহাতে হয় না। অনেক সময় চাহিদা বেশি থাকলে কিছু টাকাও দেয় আমাদের। পরে সেগুলো বিভিন্ন মাছচাষির কাছে বস্তাপ্রতি দাম ধরে বিক্রি করে।
শ্রীপুর উপজেলা পরিবার ও পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. শফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন- আমরা অনেক শিশু রোগী পাচ্ছি যাদের শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে না। পাঁচ ছয় মাসের শিশুর শরীরে অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে না এমন রোগীও পেয়েছি। এই শিশুগুলোর গ্রোথ বাড়ে না। শিশুকাল থেকেই নানা জটিল রোগে ভোগে। এরা মায়ের গর্ভে থাকা অবস্থায় মায়ের খাদ্য স্বভাবের মাধ্যমে এমন অবস্থায় দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, মানুষ মাছ হালকা তাপে ভাজে ফলে সিদ্ধ কম হয় এতে মাছের শরীরে নানা অ্যান্টিবায়োটিক থেকে যায়। বিষ্ঠাতে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিকসহ আরও বেশ কিছু ওষুধের উপস্থিতি থাকে যা মানব দেহের জন্য চরম ক্ষতিকর। বিশেষ করে টেট্রাসাইকিলিন গ্রুপের ওষুধ তাদের অন্যতম। ফলে বিষ্ঠা হয়ে মানুষের শরীরে ঢুকে পড়ে উচ্চমাত্রার নানা জটিল ওষুধ। এতে মানুষের কিডনি, লিভার এবং ফুসফুসও বিকল হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অনেক সময় ক্যানসারেরও ঝুঁকি আমরা লক্ষ করি। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন হতে হবে। মাছের খামারে মুরগির বিষ্ঠা ব্যবহার যে কোনো মূল্যে বন্ধ করতে হবে।
সূত্র: দেশ রূপান্তর
